ঢাকা, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০২:২৫:১০ PM

ডা. শফিকুর রহমান:ন্যায় ও ইনসাফের রাজনীতি চায়

মান্নান মারুফ
24-01-2026 12:32:18 PM
ডা. শফিকুর রহমান:ন্যায় ও ইনসাফের রাজনীতি চায়

আধুনিক শিক্ষা, সুসংগঠিত নেতৃত্ব এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ভিন্নধর্মী অবস্থান তৈরি করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা ডা. শফিকুর রহমান। আসন্ন ঢাকা–১৫ আসনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন বিএনপির যুবদল নেতা শফিকুল ইসলাম, যিনি মিল্টন নামেই অধিক পরিচিত।

নির্বাচনী প্রচারণা ইতোমধ্যেই জোরালো রূপ ধারণ করেছে। ঢাকা–১৫ আসনের অলিগলি, পাড়া-মহল্লা ও জনসমাগমস্থলে ডা. শফিকুর রহমানের পক্ষে শত শত নারী ও পুরুষ প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ভোটের মাঠে তাঁকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে।

ন্যায়, ইনসাফ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের অঙ্গীকার

ডা. শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক বক্তব্যের মূল সুর—ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় নৈতিকতা ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাঁর দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশকে একটি বৈষম্যহীন সমাজে রূপান্তর করার অঙ্গীকার করেছে—যেখানে ধর্ম, দল বা শ্রেণি নির্বিশেষে সবাই আইনের চোখে সমান হবে।

জামায়াতের দলীয় ঘোষণায় বলা হয়েছে, অন্যায়, অত্যাচার, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চিরতরে বন্ধ করতে তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করছেন দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা।

সততা ও সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয়

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ডা. শফিকুর রহমান সততা, মিষ্টভাষিতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য পরিচিত। দলীয় ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো দাবি করছে, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ আজ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি—যা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ কারণেই সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর প্রতি এক ধরনের আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে।

দেশে ও প্রবাসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, শৃঙ্খলা এবং আদর্শিক দৃঢ়তার কারণে দল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি সুসংগঠিত ও সক্রিয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

ছাত্র রাজনীতি ও নতুন প্রজন্মে প্রভাব

ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের উল্লেখযোগ্য সাফল্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আদর্শভিত্তিক রাজনীতির প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে ছাত্রশিবিরের এই সক্রিয় ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব বিকাশ এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে ডা. শফিকুর রহমানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান দলকে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান করছে।

প্রতিকূলতার মধ্যেও নেতৃত্বের দৃঢ়তা

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জন্য গত এক দশক ছিল চরম রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়। শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি, দলীয় কর্মকাণ্ডে বাধা এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ রাখা সহজ ছিল না। এই সংকটময় সময়ে ডা. শফিকুর রহমান দলকে ভেঙে পড়তে না দিয়ে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্বের এই দৃঢ়তা এবং সংকটে ধৈর্য ধরে এগিয়ে যাওয়ার কৌশলই তাঁকে দলের ভেতরে ও বাইরে একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

রাজনৈতিক পরিচয় ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা

ডা. শফিকুর রহমান একজন বাংলাদেশি চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ। তিনি ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০২৫–২০২৮ কার্যকালের জন্য তৃতীয় মেয়াদে দলের আমীর নির্বাচিত হন।

এর আগে তিনি দলের সেক্রেটারি জেনারেল ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। নেতৃত্বের এই ধারাবাহিকতা দলকে সাংগঠনিকভাবে সুসংহত করেছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

জন্ম, শিক্ষা ও রাজনৈতিক পথচলা

১৯৫৮ সালের ৩১ অক্টোবর মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নে ডা. শফিকুর রহমানের জন্ম। তাঁর পিতা মো. আবরু মিয়া এবং মাতা খাতিবুন নেছা। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়।

বরমচাল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৪ সালে এসএসসি এবং সিলেটের এমসি কলেজ থেকে ১৯৭৬ সালে এইচএসসি পাস করেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে সিলেট মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করে চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

ছাত্রজীবনেই তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। ১৯৭৩ সালে জাসদ ছাত্রলীগের মাধ্যমে রাজনীতিতে যুক্ত হলেও ১৯৭৭ সালে তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগ দেন। সিলেট মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নকালে শিবিরের মেডিকেল শাখা ও সিলেট শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

ব্যক্তিগত জীবন ও সমাজসেবা

ডা. শফিকুর রহমান ১৯৮৫ সালের ৫ জানুয়ারি আমেনা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। আমেনা বেগম অষ্টম জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তাঁদের দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তান রয়েছে।

রাজনীতির পাশাপাশি তিনি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে সেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত। তাঁর নিজ জেলায় প্রতিষ্ঠিত সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ নারীদের চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় জনগণ তাঁর এই উদ্যোগগুলোর প্রশংসা করেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং আদর্শিক দৃঢ়তার কারণে ডা. শফিকুর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি উল্লেখযোগ্য নাম। ঢাকা–১৫ আসনের নির্বাচনে তাঁর প্রার্থীতা কেবল ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রয়াস নয়; এটি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক শক্তি ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলেরও প্রতিফলন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর নেতৃত্বে দল একদিকে সাংগঠনিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখছে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের মধ্যে আদর্শ ও স্বপ্ন সঞ্চার করছে। আসন্ন নির্বাচন সেই নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠছে।