ঢাকা, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:৩০:০৬ PM

নিঃশব্দ বার্তা––৭

মান্নান মারুফ
17-01-2026 01:48:38 PM
নিঃশব্দ বার্তা––৭

ক্লান্তির বিস্ফোরণ

এই মৃত্যু কোনো হার্ট অ্যাটাক নয়,
এটা বছরের পর বছর জমে থাকা ক্লান্তির বিস্ফোরণ।

কুদ্দুছের মৃত্যুর পর সময় থেমে থাকেনি। দিন এগিয়েছে, মাস কেটেছে, বছর বদলেছে। শুধু বদলায়নি সন্তানের বুকের ভেতরের শূন্যতা। বাবা যে চলে গেছেএই সত্যটা তারা ধীরে ধীরে বুঝেছে, কিন্তু মানিয়ে নিতে পারেনি।

বড় মেয়েটা একসময় বাবার নাম শুনলে কাঁদত। পরে সে কাঁদা বন্ধ করেছে। কিন্তু কাঁদা বন্ধ হওয়া মানেই যে ব্যথা কমে যাওয়াতা নয়। সে স্কুলের খাতার শেষ পাতায় বাবার নাম লিখে রাখত। পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো হলে মনে হতোবাবা থাকলে খুশি হতেন। খারাপ হলে মনে হতোবাবা থাকলে হয়তো সাহস দিতেন।

ছোট ছেলেটা বাবাকে কখনো ভালো করে চিনলই না। তার স্মৃতিতে বাবা মানে শুধু একটি ছবিদেয়ালে ঝোলানো ফ্রেম। সে বাবার মতো হতে চেয়েছিল, কিন্তু জানত না, বাবার মতো কষ্ট করাই কি বড় হওয়া? একদিন সে মাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
আব্বু কি খুব ক্লান্ত ছিল?”

মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল,
হ্যাঁ রে, খুব।

এই এক শব্দেই লুকিয়ে ছিল পুরো ইতিহাস।

সন্তানরা বড় হতে হতে বুঝতে শিখলবাবার মৃত্যু হঠাৎ ছিল না। সেটা ছিল ধীরে ধীরে জমে ওঠা ক্লান্তির ফল। প্রতিটি নাঘুমানো রাত, প্রতিটি অবহেলিত অসুখ, প্রতিটি নাবলা যন্ত্রণা মিলেই সেই বিস্ফোরণ।

বাবা না থাকায় সংসারে অভাব দেখা দিল। কিন্তু অভাবের চেয়েও বড় ছিল দিকনির্দেশনার অভাব। কে শেখাবেকীভাবে শক্ত হতে হয়, কীভাবে নীরবে দায়িত্ব নিতে হয়? মা চেষ্টা করলেন দুই ভূমিকাই পালন করতে। কিন্তু বাবার জায়গাটা ফাঁকই থেকে গেল।

কখনো কখনো মেয়েটা ভাবতবাবা যদি একটু কম দায়িত্ববান হতেন, একটু নিজের কথাও ভাবতেনতাহলে কি আজ তিনি থাকতেন? এই প্রশ্নের উত্তর সে নিজেও জানত না। কিন্তু প্রশ্নটা তার ভেতরে বড় হতে লাগল।

ছেলেটা বড় হয়ে যখন বাবার গল্প শুনলপ্রবাসের রোদ, রাতের কাজ, একাকীত্বসে বাবার জন্য গর্ব করল। কিন্তু সেই গর্বের সঙ্গে জুড়ে গেল ক্ষোভও। কেন এই সমাজ বাবাদের এমন করে তোলে? কেন ক্লান্ত হওয়া পর্যন্ত কাজ করাকে সাফল্য বলা হয়?

কুদ্দুছের মৃত্যু তখন সন্তানের কাছে একটি ব্যক্তিগত শোকের চেয়েও বড় হয়ে উঠল। এটা হয়ে উঠল একটি শিক্ষাকীভাবে একটি মানুষ ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যায়, আর কেউ খেয়াল করে না।

এই শূন্যতা নিয়ে তারা বড় হলো। তাদের জীবনে কোনো নাটকীয় কান্না নেই, আছে নীরবতা। বাবা নেইএই সত্যটাই তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী।

এই মৃত্যু কোনো একদিনের ঘটনা ছিল না।
এটা ছিল বছরের পর বছর জমে থাকা ক্লান্তির বিস্ফোরণ।
আর সেই বিস্ফোরণের ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়েই
কুদ্দুছের সন্তানরা বড় হয়ে উঠেছে।

চলবে……..