পর্ব–১
রাত আড়াইটা।
নিশুতি নীরবতা যেন শহরের বুক চেপে ধরে আছে। দূরের কোনো কুকুরের একঘেয়ে ডাক, মাঝেমধ্যে জানালার কাঁচে বাতাসের হালকা ধাক্কা—সব মিলিয়ে রাতটা অদ্ভুত রকম ভারী। এমন সময় হঠাৎ ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটি নাম—হ্যারি।
ঐশি বিছানার কোণে বসে ছিল। ঘুম তার চোখে আসেনি অনেক দিন। ফোনের আলো তার মুখটাকে আরও ফ্যাকাশে করে তুলেছিল। কলটা ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো কঠিন স্বর—
“যা বলবো, তোমাকে তাই শুনতে হবে।”
সেই স্বরের মধ্যে আদেশ ছিল, ছিল এক ধরনের অধিকারবোধ। অথচ এই অধিকার জন্মেছিল মাত্র কয়েক মাসের পরিচয়ে।
হ্যারি—জার্মানিতে থাকা এক বিদেশি যুবক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়। প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর প্রতিদিনের কথা বলা, তারপর গভীর রাতের ভিডিও কল—কখন যে সম্পর্কটা গভীর হয়ে উঠেছিল, ঐশি নিজেও টের পায়নি। বিদেশে থাকা একজন মানুষ তাকে এত সময় দেয়, এত মনোযোগ দেয়—এটাই ছিল তার কাছে অচেনা এক অনুভূতি।
কিছুদিন আগেই হ্যারি ঐশিকে একটি আইফোন উপহার দিয়েছিল। কুরিয়ারে আসা সেই চকচকে বাক্স খুলে ঐশির চোখে যে ঝিলিক উঠেছিল, তা শুধু প্রযুক্তির জন্য ছিল না—তা ছিল স্বীকৃতির জন্য। কেউ তাকে মূল্য দিচ্ছে, কেউ তার কথা ভাবছে—এই বিশ্বাসের জন্য।
তারপর একদিন হ্যারি বলল, “মার্কেটিং করো, নিজের জন্য কিছু কিনো।”
ট্রান্সফার করল বেশ কিছু টাকা।
ঐশির বুকের ভেতর তখন এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছিল। কৃতজ্ঞতা, আনন্দ—আর তার সঙ্গে মিশে থাকা লোভের সূক্ষ্ম ছায়া। সে জানত না, এই লোভই একদিন তার আত্মসম্মানের শেকড় আলগা করে দেবে।
সেই রাতেও, রাত আড়াইটায়, হ্যারির কণ্ঠে ছিল আগের মতো মায়া নয়—ছিল নির্দেশ।
“আজ তুমি শুধু আমার কথা শুনবে।”
ঐশি কিছু বলতে চেয়েছিল। কিন্তু গলার স্বর যেন আটকে গেল। সে ভাবল—হ্যারি তো তাকে এত কিছু দিয়েছে। সে যদি একটু অনুরোধ করে, তাতে আপত্তি কোথায়?
হ্যারি বলল, “ক্যামেরা ঠিক করো।”
ঐশির আঙুল কাঁপছিল। স্ক্রিনে নিজের মুখ দেখে হঠাৎ সে যেন নিজেকেই অপরিচিত লাগল। সে কি সত্যিই এই মেয়েটি? যে একসময় নিজের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচত, নিজের মর্যাদা নিয়ে গর্ব করত?
হ্যারি বলল, “তোমাকে দেখতে চাই… পুরোপুরি।”
এই ‘পুরোপুরি’ শব্দটাই ঐশির হৃদয়ে ছুরির মতো বিঁধল। তবুও সে প্রতিবাদ করল না। তার মনে হচ্ছিল—না বললে যদি হ্যারি রাগ করে? যদি দূরে সরে যায়? যদি সবকিছু হারিয়ে ফেলে?
লোভ আর ভয়—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না।
একসময় সে হ্যারির কথামতো ক্যামেরার সামনে নিজেকে উন্মুক্ত করল—না কোনো আবেগে, না ভালোবাসায়; কেবল বাধ্যতায়।
ওপাশে হ্যারির চোখে বিস্ময়, তারপর এক তৃপ্তির হাসি।
ঐশির মনে হলো, সেই হাসিটা যেন তার আত্মার ওপর দিয়ে বয়ে গেল।
কলটা শেষ হওয়ার পর ঘরটা আরও অন্ধকার হয়ে উঠল। জানালার বাইরে চাঁদ মেঘের আড়ালে ঢেকে গেছে। ঐশি বিছানায় বসে রইল। ফোনটা তার হাত থেকে পড়ে গেল, কিন্তু সে তুলল না।
তার মনে হলো, এইমাত্র সে নিজের ভেতরের কোনো মূল্যবান জিনিস হারিয়ে ফেলেছে।
যে সম্পর্ককে সে ভালোবাসা ভেবেছিল, তা কি আসলে ছিল লেনদেন?
পরদিন হ্যারি আবার কল করল। কণ্ঠে এবার কোমলতা।
“তোমাকে খুব কাছে পেতে চাই,” সে বলল।
ঐশির বুক কেঁপে উঠল।
“কাছে মানে?” সে ধীরে জিজ্ঞেস করল।
“জার্মানিতে আসো। আমরা একসাথে থাকবো। তুমি শুধু আমার হবে।”
কথাগুলো শুনতে রূপকথার মতো। বিদেশ, একসাথে থাকা, ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু ঐশির ভেতরে কোথাও একটা সন্দেহ জন্ম নিচ্ছিল। যদি সবকিছুই হয় কেবল শরীরের জন্য? যদি এই ‘কাছে পাওয়া’ মানে হয় আরেক দফা ব্যবহার?
রাত আড়াইটা যেন তার জীবনে একটি সময় নয়, একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়াল—অন্ধকারের, নিঃসঙ্গতার, ভুল সিদ্ধান্তের।
ঐশি আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখল—চোখে পানি জমেছে। সে ফিসফিস করে বলল,
“আমি কি সত্যিই তাকে ভালোবাসি, নাকি তার দেওয়া জিনিসগুলোকে?”
এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই।
একসময় তার মা বলেছিলেন, “মেয়েদের জীবনে সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সম্মান।”
ঐশি তখন হেসেছিল। ভেবেছিল, এ তো পুরনো যুগের কথা। এখনকার যুগে সম্পর্ক মানে সমতা।
কিন্তু সেই রাত আড়াইটায়, স্ক্রিনের আলোয় নিজের অসহায় মুখ দেখে সে বুঝল—সমতা তখনই থাকে, যখন দু’জনের ভেতরে সমান সম্মান থাকে।
হ্যারি বারবার মেসেজ পাঠাচ্ছিল।
“মিস ইউ।”
“কাম টু মি।”
“ডোন্ট থিংক টু মাচ।”
ঐশির মনে হলো, সে যেন ধীরে ধীরে এক জালে জড়িয়ে যাচ্ছে। যে জাল তৈরি হয়েছে উপহার, টাকার ট্রান্সফার আর আবেগের কৃত্রিম আলো দিয়ে।
সেই রাতে সে আর ঘুমোতে পারল না। ফজরের আজান ভেসে এলো দূরের মসজিদ থেকে। আলো ফুটতে শুরু করল আকাশে। ঐশি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল।
ভোরের আলো তার মুখে পড়ল, কিন্তু মনটা অন্ধকারেই রয়ে গেল।
সে জানে না সামনে কী আছে। হ্যারির প্রস্তাব কি সত্যিকারের ভালোবাসা, নাকি নতুন এক বন্ধন?
সে জানে না, সে নিজেকে ফিরিয়ে আনতে পারবে কিনা সেই রাত আড়াইটার সিদ্ধান্ত থেকে।
তবে একটা কথা সে বুঝেছে—লোভ কখনো একা আসে না; তার সঙ্গে নিয়ে আসে অনুশোচনা।
রাত আড়াইটা তার জীবনে কেবল একটি সময় নয়—একটি দাগ।
যে দাগ হয়তো মুছবে না সহজে।
এখন প্রশ্ন একটাই—ঐশি কি এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে? নাকি আরও গভীরে তলিয়ে যাবে সেই বিদেশি স্বপ্নের চকচকে মরীচিকায়?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে পরবর্তী রাতের অপেক্ষায়।
চলবে.............