ঢাকা, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৩:৪৮:৫২ PM

উপন্যাস:“লুচ্চা”

মান্নান মারুফ
18-04-2026 01:15:59 PM
উপন্যাস:“লুচ্চা”

শেষ-পর্ব 

হঠাৎ করেই সবকিছু বদলে যেতে শুরু করল।

যে মেহরিন একসময় কুদ্দুছকে এড়িয়ে চলত, যে তার উপস্থিতিতে বিরক্ত হতো, যে তাকে “লুচ্চা” বলে মনে করত—সেই মেহরিনই এখন যেন অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে।

এটা এমন এক পরিবর্তন, যেটা কেউ সহজে বিশ্বাস করতে পারছিল না।

ইদানিং মেহরিন যেন নিজের মধ্যেই নেই।

সে অস্থির হয়ে ওঠে, হঠাৎ চুপ হয়ে যায়, আবার হঠাৎ করেই কুদ্দুছের খোঁজ করতে থাকে।

কেউ তাকে জিজ্ঞেস করলে, সে ঠিকমতো উত্তর দিতে পারে না।

তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবীরা একদিন অবাক হয়ে বলল—
“তোর কী হয়েছে? তুই এত অদ্ভুত আচরণ করছিস কেন?”

মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর ধীরে বলল—
“আমি… আমি জানি না…”

এই “জানি না”-র ভেতরেই লুকিয়ে ছিল তার নতুন অনুভূতির শুরু।

সে এখন বুঝতে পারছে—কুদ্দুছ তার জীবনে কতটা জায়গা দখল করে ফেলেছে।

আগে সে ভাবত—কুদ্দুছ শুধু একটা বিরক্তিকর উপস্থিতি।

কিন্তু এখন—সেই উপস্থিতির অভাবই তাকে অস্থির করে তোলে।

কুদ্দুছকে না দেখলে তার দিন অসম্পূর্ণ লাগে।
তার সঙ্গে কথা না বললে তার মন অশান্ত হয়ে থাকে।

রাতে ঘুমাতে গেলে কুদ্দুছকে তার মনে পড়ে—
“আজ কুদ্দুছের সঙ্গে ঠিকমতো কথা হলো না…”

এই ভাবনাটা তাকে ঘুমোতে দেয় না।

মেহরিন এখন প্রায় প্রতিদিনই কুদ্দুছের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে।

কিন্তু কুদ্দুছ আগের মতো নেই।

সে গম্ভীর, সংক্ষিপ্ত, দূরত্ব বজায় রেখে কথা বলে।

এই পরিবর্তনটাই মেহরিনকে আরও বেশি নাড়া দেয়।

একদিন বিকেলে মেহরিন নিজেই কুদ্দুছকে থামাল।

“তুমি কি আমাকে এড়িয়ে চলছো?”

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল—
“না।”

“তাহলে এমন আচরণ করছো কেন?”—মেহরিনের কণ্ঠে স্পষ্ট অস্থিরতা।

কুদ্দুছ শান্ত গলায় বলল—
“সবসময় সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় না।”

এই কথাটা শুনে মেহরিনের চোখে জল এসে গেল।

সে বুঝতে পারছিল—এই নীরবতার পেছনে কিছু একটা আছে।

মেহরিনের মনে ধীরে ধীরে একটা উপলব্ধি জন্ম নিতে শুরু করল।

সে মনে করতে লাগল—কুদ্দুছ কখনও তাকে কষ্ট দেয়নি, কখনও অসম্মান করেনি।

বরং সবসময় দূর থেকে সম্মান আর যত্ন দেখিয়েছে।

তাহলে সে কেন তাকে “লুচ্চা” বলেছিল?

এই প্রশ্নটা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খেতে লাগল।

একদিন রাতে মেহরিন একা বসে ছিল।

তার মনে পড়ে—সেই দিনটার কথা, যেদিন সে রাগের মাথায় তার বান্ধবীকে বলেছিল—
“ও একটা লুচ্চা…”

সে হঠাৎ নিজের মুখে হাত দিয়ে বসে পড়ল।

“আমি কী করে এটা বললাম!”

তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।

সে বুঝতে পারল—সে একটা বড় ভুল করেছে।

পরদিন মেহরিন কুদ্দুছকে খুঁজতে লাগল।

কলেজের প্রতিটা জায়গায় তাকাল—ক্লাসরুম, করিডোর, লাইব্রেরি।

শেষমেশ সে তাকে পেল—ছাদের কোণে।

কুদ্দুছ একা দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।

মেহরিন ধীরে ধীরে তার কাছে গেল।

“কুদ্দুছ…”

কুদ্দুছ ঘুরে তাকাল।

তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই, শুধু এক ধরনের শান্ত দূরত্ব।

মেহরিন কিছুক্ষণ কিছু বলতে পারল না।

তারপর হঠাৎ বলল—
“আমি তোমার কাছে একটা কথা বলতে চাই…”

কুদ্দুছ চুপ করে রইল।

মেহরিনের কণ্ঠ কাঁপছিল—
“আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম।”

এই কথাটা বাতাসে থেমে রইল।

কুদ্দুছ কিছু বলল না।

মেহরিন আবার বলল—
“আমি তোমাকে যে নামে ডেকেছি… সেটা ভুল ছিল। খুব বড় ভুল।”

তার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল।

“তুমি কখনও খারাপ ছিলে না… আমি বুঝতে পারিনি…”

কুদ্দুছ ধীরে ধীরে চোখ নামাল।

তার ভেতরে অনেক অনুভূতি একসঙ্গে জেগে উঠছে—কষ্ট, স্বস্তি, অভিমান, আর ভালোবাসা।

সে আস্তে করে বলল—
“সবাই সবসময় বুঝতে পারে না।”

এই কথাটার মধ্যে কোনো অভিযোগ ছিল না।

শুধু এক ধরনের চিরন্তন  সত্য।

ঐশি হঠাৎ বলল—
“আমি তোমাকে ছাড়া এখন কিছুই ভাবতে পারি না।”

কুদ্দুছ অবাক হয়ে তাকাল।

মেহরিন এগিয়ে এসে বলল—
“তুমি না থাকলে আমার ভালো লাগে না। তোমার সঙ্গে কথা না বললে শান্তি পাই না…”

তার কণ্ঠে ছিল এক ধরনের অসহায় ভালোবাসা।

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তার মনে হচ্ছিল—এই মুহূর্তটা সে অনেকদিন ধরে কল্পনা করেছে।

কিন্তু বাস্তবে এসে তা এত সহজ লাগছে না।

কারণ, এই ভালোবাসার পথে সে অনেক কষ্ট পেয়েছে।

সে ধীরে বলল—
“তুমি কি নিশ্চিত?”

মেহরিন বিনা দ্বিধায় বলল—
“হ্যাঁ।”

কুদ্দুছ আকাশের দিকে তাকাল।

তার মনে পড়ল—তার সব নিঃশব্দ রাত, সব অশ্রু, সব ডায়েরির পাতা।

তার ভালোবাসা কখনও বদলায়নি।

শুধু সময় বদলেছে।

সে আবার মেহরিনের দিকে তাকাল।

এই প্রথম তার চোখে আবার সেই পুরনো কোমলতা ফিরে এল।

সে আস্তে করে বলল—
“আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি।”

মেহরিনের মুখে অশ্রুর মাঝে একটুকরো হাসি ফুটে উঠল।

চারপাশের মানুষজন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

যে ছেলেটাকে এতদিন “লুচ্চা” বলে ভাবা হয়েছিল, সেই ছেলেটাই এখন মেহরিনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।

তাহলে কি সত্যিই—
নিন্দা করা মানুষটিকেই শেষ পর্যন্ত ভালোবেসে ফেলল মেহরিন?

উত্তরটা খুব সহজ—

হ্যাঁ।

ভালোবাসা কখনও সরল পথে আসে না।

কখনও তা ভুল বোঝাবুঝির ভেতর দিয়ে যায়, কখনও অপমানের ভেতর দিয়ে।

কিন্তু যদি তা সত্যি হয়—তাহলে একদিন না একদিন তা নিজের জায়গা খুঁজে নেয়।

কুদ্দুছ আর মেহরিন এখন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।

তাদের মাঝখানে আর কোনো ভুল বোঝাবুঝি নেই।

শুধু আছে—একটা দীর্ঘ পথের পর পাওয়া উপলব্ধি।

কুদ্দুছ মনে মনে বলল—

“লুচ্চা”—এই শব্দটাই একদিন তার সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল।
আজ সেই শব্দটাই যেন তার ভালোবাসার গল্পের এক অধ্যায়।

আকাশে তখন হালকা বাতাস।

সূর্য ডুবছে।

আর তাদের গল্প—
অবশেষে একটা শান্ত, সুন্দর পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

— সমাপ্ত —