ঢাকা, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৪:৪৯:৫৫ PM

উপন্যাস:“কষ্ট”

মান্নান মারুফ
12-04-2026 01:39:50 PM
উপন্যাস:“কষ্ট”

শেষ পর্ব

মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে—
যখন সে পিছনে তাকিয়ে দেখে, সে কতটা পথ পেরিয়ে এসেছে।

কুদ্দুছের জীবনেও সেই মুহূর্তটা এসে গেছে।

এক বছর আগের কুদ্দুছ আর আজকের কুদ্দুছ—
দুজন যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ।

একসময় যে ছেলেটা নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলেছিল,
আজ সে নিজের পরিচয় নিজেই তৈরি করছে।

সকাল।

কুদ্দুছ এখন আর অন্ধকার ঘরে ঘুম ভাঙে না।

তার ছোট্ট ঘরটা এখন গুছানো, পরিষ্কার।

দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার, পাশে একটা টেবিল—
তার উপর খাতা, কিছু বই, আর একটা ল্যাপটপ।

হ্যাঁ, এখন তার নিজের একটা ল্যাপটপ আছে।

ডেলিভারির কাজের পাশাপাশি পার্ট-টাইম থেকে ফুল-টাইম হয়ে গেছে তার অফিসের চাকরি।

সে এখন একটা ছোট কোম্পানিতে ডাটা অপারেটর হিসেবে কাজ করে।

বেতন খুব বেশি না—
কিন্তু সম্মান আছে।

সকালে সে আয়নার সামনে দাঁড়ায়।

নিজের দিকে তাকায়।

এই মানুষটাকে সে এখন চিনতে পারে।

চোখে আত্মবিশ্বাস, মুখে স্থিরতা।

সে আস্তে করে বলে—

“আমি পেরেছি…”

এই কথাটা বলার জন্য তাকে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে।

অপমান, অবহেলা, একাকিত্ব—

সবকিছু।

কিন্তু সে হাল ছাড়েনি।

একদিন অফিসে তার বস তাকে ডাকে।

“কুদ্দুছ, আমরা তোমার কাজ নিয়ে খুব খুশি। আমরা ভাবছি তোমাকে সুপারভাইজার পজিশনে প্রমোট করবো।”

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।

এই মুহূর্তটা সে অনেকবার কল্পনা করেছে।

কিন্তু বাস্তবে এটা শোনার অনুভূতি—

সম্পূর্ণ আলাদা।

সে ধীরে বলে—

“ধন্যবাদ, স্যার… আমি চেষ্টা করবো আরও ভালো করার।”

তার চোখে একটু পানি চলে আসে।

এই কান্নাটা দুঃখের না—

এইটা অর্জনের।

সেদিন সন্ধ্যায় সে আবার সেই পুরনো চায়ের দোকানে যায়।

এই জায়গাটা এখনো আগের মতোই আছে—

কিন্তু বদলে গেছে মানুষগুলোর দৃষ্টি।

“এই কুদ্দুছ! এখন তো দেখি বেশ ভালোই করছিস!” — কেউ একজন বলে।

আরেকজন বলে—

“ভাই, তোর মতো স্ট্রাগল করলে যে কেউই কিছু করতে পারবে!”

কুদ্দুছ শুধু হাসে।

কারণ সে জানে—

এই একই মানুষ একসময় তাকে চিনত না।

কিন্তু এখন সে আর সেটা নিয়ে ভাবে না।

কারণ সে বদলে গেছে।

হঠাৎ করে তার সামনে এসে দাঁড়ায়—

ঐশি।

অনেকদিন পর।

কুদ্দুছ একটু অবাক হয়।

ঐশি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।

তারপর বলে—

“কেমন আছো?”

এই প্রশ্নটা একসময় খুব দরকার ছিল।

আজ সেটা শুধু একটা আনুষ্ঠানিকতা মনে হয়।

কুদ্দুছ শান্ত গলায় বলে—

“ভালো আছি।”

ঐশি তার দিকে তাকায়।

তার চোখে কিছু একটা আছে—
হয়তো অনুশোচনা, হয়তো আফসোস।

“আমি… তোমার কথা শুনেছি। তুমি এখন অনেক ভালো করছো।”

কুদ্দুছ মাথা নাড়ে।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর ঐশি ধীরে বলে

“আমি তখন… তোমাকে বুঝতে পারিনি।”

এই কথাটা কুদ্দুছের কানে পৌঁছায়।

কিন্তু তার ভেতরে কোনো ঝড় ওঠে না।

কারণ সেই ঝড় অনেক আগেই থেমে গেছে।

সে শুধু বলে—

“ঠিক আছে।”

ঐশি অবাক হয়।

“তুমি কিছু বলবে না?”

কুদ্দুছ হালকা হাসে—

“সব কথা বলার দরকার হয় না।”

এই একটা বাক্যেই অনেক কিছু লুকানো।ঐশি বুঝতে পারে—

সে সেই আগের কুদ্দুছকে আর পাবে না।

কারণ এই কুদ্দুছ—

নিজেকে নতুন করে তৈরি করেছে।

ঐশি ধীরে বলে—

“ভালো থেকো…”

কুদ্দুছ বলে—

“তুমিও।”

ঐশি চলে যায়।

কুদ্দুছ তার দিকে তাকিয়ে থাকে না।

কারণ তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু আর কেউ না—

সে নিজে।

রাত।

কুদ্দুছ বাসায় ফিরে।

সে তার পুরনো খাতাটা বের করে।

প্রথম পাতায় লেখা—

“আমি কি হতে চাই?”

তার নিচে—

“আমি শুরু করেছি।”

আজ সে নতুন করে লিখে—

“আমি পৌঁছাতে শুরু করেছি।”

সে কিছুক্ষণ খাতার দিকে তাকিয়ে থাকে।

তার মনে পড়ে—

সেই অন্ধকার রাতগুলো,
সেই একাকিত্ব,
সেই ভাঙন—

সবকিছুই তাকে এখানে নিয়ে এসেছে।

সে বুঝতে পারে—

কষ্ট তাকে ভাঙেনি।

কষ্ট তাকে তৈরি করেছে।

কুদ্দুছ জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

আকাশে চাঁদ উঠেছে।

সে ধীরে বলে—

“আমি আর অদৃশ্য না…”

এই পৃথিবীতে তার একটা জায়গা আছে।

একটা পরিচয় আছে।

এবং সেই পরিচয়—

সে নিজেই তৈরি করেছে।

কষ্ট কখনও দেখা যায় না—
কিন্তু সেই কষ্টই একদিন মানুষকে নতুন করে গড়ে তোলে।

কুদ্দুছের গল্প শেষ না—

এটা তার নতুন জীবনের শুরু।

সমাপ্ত।।