পর্ব–৬ (শেষ পর্ব)
“তুমি আমার সকালবেলা কফির মিষ্টি ঘ্রাণ,
তোমার প্রেমেই ভরে ওঠে আমার প্রতিটা প্রাণ।
ঐশিই আমার বিপদের বন্ধু।
সকল বিপদ, দুঃখের সময়, খারাপ দিনের অন্ধকার থেকেও সঙ্গী ছিল ঐশি।”
এই কথাগুলো আমি কোনোদিন তাকে বলিনি। শুধু ডায়েরির পাতায় লিখে রেখেছিলাম, ঠিক যেন এক অপ্রকাশিত স্বীকারোক্তি—যা বলা হয়নি, কিন্তু বেঁচে ছিল।
ভোরের আলো ফোটার আগে আমার অভ্যাস ছিল বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক কাপ কফি হাতে নেওয়া। কফির ধোঁয়া যখন ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উঠত, তখন মনে হতো—ঐশির হাসিটাও ঠিক এমনই, নরম, উষ্ণ আর অদৃশ্যভাবে ছড়িয়ে পড়া। জীবনের কত বিপর্যয়, কত ব্যর্থতা, কত ভাঙন—সবকিছুর মাঝেও সে ছিল। যেন আমার জীবনের প্রতিটি ভাঙা সেতুর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা নীরব এক প্রহরী।
আমাদের প্রথম পরিচয়টা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু সাধারণের ভেতরেও কখন যে অসাধারণ একটা অনুভূতি জন্ম নেয়, তা টের পাওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে হঠাৎ বৃষ্টির দিনে আটকে পড়া, এক ছাতার নিচে পাশাপাশি দাঁড়ানো—সেই মুহূর্তেই হয়তো আমার স্বপ্নের শুরু।
আমি তখন সংগ্রাম করছি। বাবার অসুস্থতা, সংসারের টানাপোড়েন, পড়াশোনার চাপ—সব মিলিয়ে জীবন যেন প্রতিদিন এক নতুন যুদ্ধ। বন্ধুরা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল। কারও সময় ছিল না, কারও ইচ্ছে ছিল না। অথচ ঐশি—সে প্রতিদিন ফোন করত, বলত,
“সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি শুধু হাল ছেড়ো না।”
আমার মনে হতো, তার কণ্ঠেই যেন একটা আশ্রয় আছে। পৃথিবী যদি আমাকে ত্যাগও করে, ঐশি করবে না।
কিন্তু জীবন তো গল্পের মতো সহজ নয়।
একদিন খবর এল—ঐশির বিয়ে ঠিক হয়েছে। পরিবারের সিদ্ধান্ত। পাত্র প্রতিষ্ঠিত, স্বচ্ছল, সম্মানিত। ঐশি ফোন করে বলল, কণ্ঠে এক অদ্ভুত কাঁপন,
“আমি চেষ্টা করেছি… কিন্তু পারলাম না।”
আমি বুঝেছিলাম—সে লড়েছে। কিন্তু সব লড়াই জেতা যায় না। কিছু লড়াইয়ে হার মানতে হয়, কারণ সেখানে ভালোবাসার চেয়ে দায়িত্ব বড় হয়ে ওঠে।
সেই রাতে আমি প্রথমবার বুঝলাম—স্বপ্ন ভাঙার শব্দ কেমন হয়। কোনো আওয়াজ নেই, কিন্তু বুকের ভেতর এক অসহনীয় শূন্যতা।
ঐশি বিয়ের পর অন্য শহরে চলে গেল। যোগাযোগ ধীরে ধীরে কমে এল। আমি নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দিলাম। সংসারের দায়িত্ব, চাকরি, নতুন শহর—সবকিছু আমাকে ব্যস্ত রাখল, কিন্তু শূন্যতা পূরণ করল না।
প্রতিদিন ভোরে কফির কাপ হাতে নিলে মনে পড়ত—
“তুমি আমার সকালবেলা কফির মিষ্টি ঘ্রাণ…”
একদিন হঠাৎ খবর পেলাম—ঐশি অসুস্থ। দীর্ঘদিন ধরে ভেতরে ভেতরে ভুগছিল। সম্পর্কটা নাকি সুখের ছিল না। সে নাকি অনেক কিছু চেপে রেখেছিল, শুধু সবাইকে ভালো রাখার জন্য।
আমি ছুটে গেলাম হাসপাতালে। সাদা চাদরে ঢাকা বিছানায় শুয়ে থাকা ঐশিকে দেখে মনে হলো—সে যেন অনেক দূরের কোনো স্বপ্নে ডুবে আছে। তার চোখ দুটো ক্লান্ত, কিন্তু আমাকে দেখে মৃদু হাসল।
“তুমি এসেছ?”
তার কণ্ঠে বিস্ময় নয়, ছিল নিশ্চিন্ততা।
আমি চুপ করে তার হাতটা ধরলাম। কত কথা জমে ছিল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। সে ধীরে বলল,
“তুমি জানো, তোমার স্বপ্নগুলো আমি এখনো দেখি। তুমি একদিন বড় হবে—আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি।”
আমার চোখ ভিজে উঠল। আমি বলতে চাইলাম—
“তুমিই তো আমার স্বপ্ন ছিলে।”
কিন্তু আবারও বলা হলো না।
ঐশি কয়েকদিন পর চলে গেল। খুব নীরবে। কোনো অভিযোগ ছাড়া, কোনো দাবি ছাড়া। যেন সে এসেছিল শুধু আমাকে পথ দেখাতে, তারপর অদৃশ্য হয়ে গেছে।
তার মৃত্যুর পর আমি অনেকদিন নিজেকে সামলাতে পারিনি। পৃথিবীটা অর্থহীন মনে হতো। কিন্তু একদিন ডায়েরির পুরনো পাতাগুলো উল্টাতে গিয়ে সেই কথাগুলো আবার চোখে পড়ল—
“ঐশিই আমার বিপদের বন্ধু…”
হঠাৎ মনে হলো—সে তো এখনো আছে। আমার প্রতিটি সাহসে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে, প্রতিটি লড়াইয়ে।
আমি বুঝলাম, ভালোবাসা মানেই একসঙ্গে থাকা নয়। ভালোবাসা মানে কাউকে এমনভাবে নিজের ভেতরে ধারণ করা, যে সে অনুপস্থিত থেকেও উপস্থিত থাকে।
বছর কেটে গেল। আমি নিজের পায়ে দাঁড়ালাম। সংসারকে গুছিয়ে তুললাম। মায়ের মুখে হাসি ফিরল। সমাজের চোখে আমি সফল। কিন্তু গভীর রাতে এখনো কখনো বারান্দায় দাঁড়ালে মনে হয়—ঐশি পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
ভোরের কফির কাপটা হাতে নিয়ে আমি আজও বলি—
“তুমি আমার সকালবেলা কফির মিষ্টি ঘ্রাণ…”
হয়তো সে শোনে না, হয়তো শোনে। কিন্তু আমি জানি, আমার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়গুলোতে সে যে আলো জ্বালিয়েছিল, সেই আলোই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
স্বপ্ন ভাঙে—কিন্তু স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা যদি না ভাঙে, তবে মানুষ টিকে থাকে।
ঐশি আমার জীবনে এসে আমাকে শিখিয়েছিল—
ভালোবাসা অধিকার নয়, আশ্রয়।
ভালোবাসা দাবি নয়, প্রার্থনা।
ভালোবাসা চিরকাল পাশে থাকা নয়, প্রয়োজনে দূরে গিয়েও কারও শক্তি হয়ে থাকা।
আজ এত বছর পর বুঝি, সে যদি আমার জীবনে না আসত, তবে হয়তো আমি হার মানতাম। হয়তো মাঝপথেই থেমে যেতাম। সে ছিল আমার বিপদের বন্ধু, দুঃখের দিনের সাহস, খারাপ সময়ের প্রেরণা।
আমাদের গল্পটা হয়তো পূর্ণতা পায়নি, কিন্তু অপূর্ণতাই কখনো কখনো সবচেয়ে গভীর পূর্ণতা হয়ে ওঠে।
স্বপ্নের শেষ অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে আমি শুধু এটুকুই বলি—
ঐশি, তুমি নেই—তবু আছো।
আমার প্রতিটি প্রভাতে, প্রতিটি নিশীথে, প্রতিটি অর্জনে।
আর যতদিন সকাল হবে, কফির ধোঁয়া উঠবে, ততদিন তুমি থাকবে—
আমার স্বপ্ন হয়ে।