কারাফটকের ওপারে
কুদ্দুছ অস্থির ছিল।
কিন্তু সেই অস্থিরতা চিৎকারে নয়—পাথরের ভেতরের কম্পনের মতো।
সে মুহূর্তেই চুপ হয়ে গেল।
কোনো প্রশ্ন করল না।
কোনো অভিযোগও না।
কারাগারের ফটকে যা দেখেছে, তার পর আর বলার মতো শব্দ তার ভেতরে অবশিষ্ট ছিল না। শব্দ সেখানে ছোট হয়ে যায়, যেখানে শূন্যতা বিশাল।
সে শিশুটিকে কোলে নিতে চেয়েছিল।
হাত দুটো সামান্য এগিয়েও থেমে যায়।
হাত বাড়ানোর অধিকার যেন তার নেই—এই বোধ তাকে আটকে দেয়।
তার সামনে যে শুয়ে আছে, সে শুধু তার সন্তান নয়—তার ব্যর্থতার নীরব দলিল।
নাফিজ।
কুদ্দুছ ধীরে নিচু হয়ে শিশুটির শরীরে হাত রাখে।
এই প্রথম—এবং শেষবার।
তার আঙুল কাঁপে।
গলা শুকিয়ে আসে।
অবশেষে সে ফিসফিস করে বলে—
“বাবা… তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও।
আমি অপরাধী।
আমি পারিনি… তোমাদের জন্য কিছু করতে।”
এই কথার ভেতর কোনো নাটক নেই।
এটা একজন মানুষের নিজের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তি।
তারপর সে তাকায় সুর্বনার দিকে।
চোখে চোখ রাখে।
এই দৃষ্টির মধ্যে হাজারো কথা ছিল—যেগুলো কোনোদিন বলা হয়নি।
ভয়, আশা, ক্লান্তি, আর ভালোবাসা—সব একসঙ্গে জমে আছে সেই দৃষ্টিতে।
কুদ্দুছ শুধু বলে—
“আমাকে ক্ষমা করিও, সুর্বনা।”
আর কিছু নয়।
কারণ ক্ষমা চাওয়ার ভাষাও কখনো কখনো ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
সে আর কিছু চায় না।
শুধু শান্তিটুকু চায়—ওদের জন্য।
কুদ্দুছ তখন তার ভাইয়ের দিকে তাকায়।
তার চোখে কোনো অনুরোধ নেই—আছে নির্দেশের মতো স্থিরতা।
“আমার কেনা জমিতে ওদের দাফন দিও।”
এই জমিটা সে কিনেছিল ভবিষ্যতের জন্য।
আজ সেই ভবিষ্যৎই সেখানে শুয়ে যাবে।
কবরের পাশে কুদ্দুছ দাঁড়াতে পারে না।
নিয়ম, সময়—সবকিছু তার বিপক্ষে।
তাই সে দুই টুকরা মাটি তুলে নেয়।
নিজের হাতে দিতে পারে না।
ভাইয়ের হাতে তুলে দেয়।
এই দুই টুকরা মাটি যেন তার জীবনের শেষ অধিকার—
স্বামী হিসেবে এক টুকরা,
বাবা হিসেবে আরেক টুকরা।
কারাফটক থেকে সুর্বনা ও নাফিজ বিদায় নেয়।
এই বিদায় কোনো উচ্চারণে নয়—নীরব মাটির নিচে।
মানুষ দাঁড়িয়ে আছে চারপাশে।
কেউ চোখ মুছছে।
কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।
কেউ আবার এই দৃশ্যকে গল্প বানানোর উপকরণ হিসেবে জমিয়ে রাখছে।
কুদ্দুছ কিছুই দেখে না।
তার চোখ তখন ভেতরের দিকে তাকানো।
সে বুঝে গেছে—কারাফটক শুধু একটি জায়গা নয়।
এটা এক অবস্থা।
যেখানে মানুষ আটকে পড়ে নিজের অসহায়তার সঙ্গে।
কারাফটক কুদ্দুছকে দুবার বন্দি করেছে—
একবার লোহার শিকে,
আরেকবার এই শূন্যতায়।
দাফন শেষ হয়।
মানুষ ধীরে ধীরে সরে যায়।
কবর দুটো নীরব।
আকাশ নির্বিকার।
কুদ্দুছকে আবার ফিরিয়ে নেওয়া হয় কারাগারে।
এই ফেরা আর আগের মতো নয়।
এখন তার ভেতরে কেউ অপেক্ষা করে না।
কেউ তার নাম ধরে ডাকবে না।
কারাগারের দেয়ালগুলো আজ আরও কাছাকাছি মনে হয়।
আলো আরও মলিন।
কুদ্দুছ বসে থাকে।
চোখ শুকনো।
মন পাথর।
কিন্তু এই পাথরের ভেতরে আগুন নিভে যায়নি।
এই আগুন প্রতিশোধের নয়—
এই আগুন প্রশ্নের।
এই প্রশ্ন সমাজকে করবে।
রাষ্ট্রকে করবে।
মানুষকে মানুষ হিসেবে কতটুকু জায়গা দেওয়া হয়—এই প্রশ্ন।
কারাফটক বন্ধ হয়েছে।
কিন্তু তার শব্দ রয়ে গেছে।
যতদিন কোনো সুর্বনা একা পড়ে থাকবে,
যতদিন কোনো নাফিজ জন্মের পর বাবার কোলে আসতে পারবে না,
ততদিন কারাফটক থাকবে।
কুদ্দুছ জানে—
এই গল্প এখানেই শেষ নয়।
কিন্তু এই সংসার—
এই তিনজন—
এখানেই শেষ।
নীরবভাবে।
চূড়ান্তভাবে।