বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন অনেক নেতা আছেন, যারা সুসময় এলে সামনে আসেন, আবার দুঃসময় এলে আড়ালে সরে যান। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে তাদের আনুগত্য, সাহস ও মানবিক অবস্থান। অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস সেই বিরল কাতারের একজন — যিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়েও দলের পাশে অবিচল থাকা এক নির্ভরতার নাম।
বিগত দেড় যুগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি চাপে থাকা দলগুলোর একটি ছিল বিএনপি। মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সাংগঠনিক সংকটের মধ্য দিয়ে দলটি যখন টিকে থাকার সংগ্রামে ব্যস্ত, তখন অনেকেই দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু সেই কঠিন সময়েই নিরবে, নিঃস্বার্থভাবে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন যে কজন মানুষ, তাদের মধ্যে অন্যতম নাম শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।
তিনি ছিলেন না আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কোনো উচ্চকণ্ঠ রাজনীতিক। বরং পর্দার আড়ালে থেকে সাংগঠনিক কাজ, রাজনৈতিক সমন্বয় এবং নেতাকর্মীদের পাশে থাকার মধ্য দিয়েই নিজের ভূমিকা পালন করেছেন। বিএনপির দুঃসময়ে অনেক পরিচিত মুখ যখন নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, তখন শিমুল বিশ্বাস ছিলেন সক্রিয়, দৃঢ় এবং বিশ্বস্ত।
দলীয় নেতাকর্মীদের ভাষায়, “বিপদের সময় মানুষ চেনা যায়।” আর সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া একজন নেতার নাম শিমুল বিশ্বাস।
ঐতিহ্যবাহী পরিবার থেকে জনমানুষের রাজনীতিতে
পাবনার কুঠিপাড়ার এক শিক্ষিত ও সমাজসেবামূলক পরিবারে জন্ম তাঁর। পিতা মরহুম আজিজুল ইসলাম বিশ্বাস ছিলেন ন্যায়পরায়ণ ও সমাজনিষ্ঠ মানুষ। আর দাদা আলহাজ আহেদ আলী বিশ্বাস ছিলেন ব্রিটিশ আমলের খ্যাতিমান ঠিকাদার ও সমাজহিতৈষী। পরিবার থেকেই তিনি পেয়েছেন মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা।
শৈশব থেকেই সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, কষ্ট ও সংগ্রামকে কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনের ভিত্তি তৈরি করে।
গোপাল চন্দ্র ইনস্টিটিউট, এডওয়ার্ড কলেজ ও শহীদ বুলবুল কলেজে পড়াশোনার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই নেতৃত্বের গুণাবলি প্রকাশ পেতে শুরু করে। শহীদ বুলবুল কলেজে টানা তিনবার ভিপি নির্বাচিত হওয়া ছিল তাঁর জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক দক্ষতার বড় প্রমাণ।
তবে তাঁর রাজনীতির মূল দর্শন ছিল ভিন্ন। ক্ষমতা নয়, মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার মাধ্যম হিসেবেই তিনি রাজনীতিকে দেখেছেন।
আইনজীবী থেকে শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বর
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পাস করার পর পাবনা বার অ্যাসোসিয়েশনে যোগ দেন শিমুল বিশ্বাস। কিন্তু আদালতের গণ্ডির ভেতর নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন সক্রিয়ভাবে।
তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠে শ্রমিক ফেডারেশন ও পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন। সাধারণ শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও সংগঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরিতে তিনি কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। ফলে রাজনীতির পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের কাছেও তিনি হয়ে ওঠেন আস্থার প্রতীক।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্বেও দক্ষতার স্বাক্ষর
২০০২ সালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশনের (BIWTC) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। সে সময় প্রতিষ্ঠানটি ছিল লোকসানের বোঝা বহনকারী একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা। কিন্তু তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা, সততা ও দূরদর্শিতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক ধারায় ফিরে আসে।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সময়ও তিনি প্রমাণ করেন— রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবেও তিনি সফল। নৌপথ সংস্কার, ফেরিঘাট উন্নয়ন এবং যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন গতি আনতে তাঁর ভূমিকা আজও স্মরণ করেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে পাবনা থেকে ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে তাঁর উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয়।
খালেদা জিয়ার আস্থার মানুষ
১৯৯৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিএনপিতে যোগ দেন শিমুল বিশ্বাস। পরে দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।
এই দায়িত্ব ছিল শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিএনপির সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক সময়ে খালেদা জিয়ার অফিসিয়াল কার্যক্রম, যোগাযোগ ও সাংগঠনিক সমন্বয়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
রাজনৈতিক মামলার ভয়, প্রশাসনিক চাপ কিংবা ব্যক্তিগত ঝুঁকি— কোনো কিছুই তাঁকে দল থেকে দূরে সরাতে পারেনি। বরং প্রতিকূল সময়েই তিনি আরও বেশি সক্রিয় থেকেছেন।
বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের অনেকেই মনে করেন, “দলের সুসময় নয়, দুঃসময়েই একজন নেতার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়।” আর সেই অর্থে শিমুল বিশ্বাস নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন পরীক্ষিত নেতা হিসেবে।
রাজনীতির বাইরেও এক মানবিক অধ্যায়
শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের জীবনের সবচেয়ে আলোকিত দিক সম্ভবত তাঁর মানবসেবামূলক কর্মকাণ্ড।
নিজ পরিবারের নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন “আলহাজ আহেদ আলী বিশ্বাস মানব কল্যাণ ট্রাস্ট”। এই ট্রাস্টের মাধ্যমে শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, আশ্রয়হীন মানুষের পুনর্বাসন এবং কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যাপক কাজ করেছেন তিনি।
প্রায় ১১০ একর জমি দান করে গড়ে তুলেছেন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাঠাগার ও এতিমখানা। তাঁর উদ্যোগে ৩,৬০০-এরও বেশি গৃহহীন পরিবার আশ্রয় পেয়েছে। ৩,০০০-এর বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। নির্মাণ করেছেন শতাধিক মসজিদ ও মাদ্রাসা।
এগুলো শুধুই পরিসংখ্যান নয়; বরং একজন মানুষের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার বাস্তব প্রতিফলন।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেখানে উন্নয়ন প্রায়ই রাজনৈতিক প্রচারণার ভাষায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, সেখানে শিমুল বিশ্বাসের এই কাজগুলো অনেকটাই নীরব কিন্তু স্থায়ী প্রভাব তৈরি করেছে।
ব্যক্তিজীবনে সরল, অবস্থানে দৃঢ়
ধনী পরিবারের সন্তান হয়েও ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত সাধারণ ও সংযত জীবনযাপন করেন শিমুল বিশ্বাস। রাজনৈতিক ক্ষমতার চাকচিক্যের চেয়ে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেন তিনি।
সহধর্মিণী পারভীন আফরোজ তনু দীর্ঘদিন ধরে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক পথচলার নীরব সহযাত্রী। তাঁদের দুই সন্তানও নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছেন।
তাঁর ঘনিষ্ঠদের মতে, “শিমুল বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর মানবিকতা।”
কেন আজও আলোচনায় শিমুল বিশ্বাস?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আনুগত্য এখন অনেকাংশেই স্বার্থনির্ভর হয়ে পড়েছে— এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। সেই বাস্তবতায় শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের মতো নেতারা ব্যতিক্রম হিসেবেই বিবেচিত হন।
তিনি আলোচনায় আসেন না উচ্চকণ্ঠ বক্তব্যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণায় কিংবা রাজনৈতিক নাটকীয়তায়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে নীরবে কাজ করে যাওয়া, সংকটে পাশে থাকা এবং মানবিক মূল্যবোধ ধরে রাখার কারণেই তিনি আলাদা হয়ে উঠেছেন।
বিএনপির রাজনীতিতে তিনি শুধু একজন সাবেক এমপি বা বিশেষ সহকারী নন; বরং দুঃসময়ের বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা হিসেবেই অধিক পরিচিত।
অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের রাজনৈতিক জীবন কেবল ক্ষমতার ইতিহাস নয়; এটি এক ধরনের দায়বদ্ধতার গল্প। এমন এক সময়ে, যখন রাজনীতিকে অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে দেখেন, তখনও তিনি মনে করেন — রাজনীতি এখনও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি পবিত্র দায়িত্ব হতে পারে।
তিনি প্রমাণ করেছেন, সত্যিকারের নেতৃত্ব শুধু ক্ষমতার চেয়ারে বসে তৈরি হয় না; বরং তৈরি হয় সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে। আর সেই কারণেই হয়তো বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর কাছে শিমুল বিশ্বাস শুধু একজন নেতা নন, বরং দুঃসময়ের সাহসী, বিশ্বস্ততা ও মানবিক রাজনীতির এক জীবন্ত প্রতীক।