পর্ব–৭
তাজুল মিতুর হাতটা টেবিলের উপর শক্ত করে ধরে বললো—
“মিতু, বিশ্বাস করো আমি কিছু জানি না। আমি শুধু ওকে চাবি দিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমি বাসায় যাবার আগেই কেউ হয়তো আমাদের বাসায় গিয়ে ওকে খু!ন করেছে।”
মিতুর মাথাটা যেন ঘুরে উঠলো। শব্দগুলো তার কানে ঢুকছে, কিন্তু মনের ভেতর সেগুলো জায়গা করে নিতে পারছে না।
হঠাৎ তার মনে হলো ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। বুকের ভেতর যেন কেউ শক্ত করে কিছু চেপে ধরেছে।
তার দম বন্ধ লাগতে শুরু করলো।
মিতু তাড়াতাড়ি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। এক মুহূর্তও আর সেখানে থাকতে পারলো না। কাউকে কিছু না বলেই দ্রুত অফিস থেকে বের হয়ে গেল।
তাজুলও পিছন পিছন দৌড়ে বের হলো।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তাজুল কাঁপা গলায় বলছিল—
“আমি এখনো কাউকে কিছু বলিনি। বিশ্বাস করো খুব ভয় লাগছে। আমি রুমের মধ্যে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম… তারপর তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে সরাসরি তোমার কাছে চলে এসেছি।”
মিতু কোনো কথা বলছিল না।
তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে আফরিনের মুখ। সেই হাসিখুশি মুখটা।
সকালে বের হওয়ার সময় আফরিন দরজায় দাঁড়িয়ে বলেছিল—
“আপু, আজকে কিন্তু তাড়াতাড়ি বাসায় আসবা। আমি তোমার জন্য নতুন একটা রেসিপি রান্না করবো।”
কথাগুলো এখন মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে।
রাস্তার পাশে একটা সিএনজি থামলো।
তাজুল দ্রুত দরজা খুলে বললো—
“চলো, তাড়াতাড়ি বাসায় যাই।”
দুজনেই চুপচাপ সিএনজিতে উঠে বসলো।
পুরো পথটা তারা কেউ কোনো কথা বললো না। শুধু গাড়ির শব্দ আর শহরের কোলাহল দূর থেকে ভেসে আসছিল।
মিতুর মনে হচ্ছিল এই পথটা যেন শেষই হচ্ছে না।
অবশেষে তারা বাসার সামনে পৌঁছালো।
গেটের কাছে বসে থাকা দারোয়ান মিতুকে দেখে অবাক হয়ে গেল।
সে উঠে দাঁড়িয়ে বললো—
“ভাবি, আপনাকে এমন লাগছে কেন? আর এমন সময় আপনি বাসায়? কোথাও কিছু হয়েছে নাকি?”
মিতু তার দিকে তাকালো, কিন্তু কোনো উত্তর দিল না।
তার চোখদুটো লাল হয়ে গেছে। মুখটা ফ্যাকাসে।
তাজুল শুধু বললো—
“চাচা, একটু পরে বাড়িওয়ালাকে আমাদের বাসায় পাঠাবেন।”
দারোয়ান কিছু বুঝতে না পেরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
মিতু তখন দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে।
প্রতিটা ধাপ যেন তার কাছে পাহাড়ের মতো লাগছে।
হৃদপিণ্ডটা অস্বাভাবিকভাবে ধকধক করছে।
ফ্ল্যাটের দরজার সামনে এসে সে এক মুহূর্ত থেমে গেল।
তার হাত কাঁপছিল।
তবুও ধীরে ধীরে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো।
ঘরের ভেতরে এক অদ্ভুত নীরবতা।
যেন এই ঘরে জীবনের সব শব্দ থেমে গেছে।
মিতু ধীরে ধীরে আমাদের রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই তার বুক কেঁপে উঠলো।
ভেতরে তাকিয়ে সে দেখলো—
সত্যিই…
তার ছোট বোনটা চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে গেছে।
বিছানার উপর নিথর হয়ে পড়ে আছে আফরিন।
চোখদুটো আধখোলা।
মুখে কোনো শব্দ নেই, কোনো অভিযোগ নেই।
মিতুর মনে হলো—
না…
কেউ তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে।
চিরদিনের জন্য।
হঠাৎ মিতুর পা দুটো দুর্বল হয়ে গেল।
সে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লো।
তার চোখ দিয়ে নিঃশব্দে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
কান্নার শব্দও যেন বের হতে চাইছে না।
শুধু বুকের ভেতর জমে থাকা অসহনীয় যন্ত্রণা তাকে নিঃশব্দে ভেঙে দিচ্ছে।
তাজুল দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে নিচ থেকে আসার সময় দারোয়ানকে বলে এসেছিল বাড়িওয়ালাকে যেন দ্রুত বাসায় পাঠায়।
কারণ এই ঘটনা একা সামলানো সম্ভব না।
কিছুক্ষণ পরই সদর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
তারপর একজনের কণ্ঠ ভেসে এলো—
“তাজুল সাহেব, দরজা খুলবেন?”
বাড়িওয়ালা।
তাজুল গিয়ে দরজাটা খুললো।
বাড়িওয়ালা ভেতরে ঢুকেই উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন—
“কি হয়েছে? দারোয়ান বললো জরুরি ডেকেছেন।”
তাজুল কোনো কথা না বলে তাকে বেডরুমের দিকে নিয়ে গেল।
ঘরের ভেতরে ঢুকতেই বাড়িওয়ালা থমকে দাঁড়ালেন।
তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
বিছানার উপর পড়ে থাকা নিথর দেহটার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলেন তিনি।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন—
“ইন্না লিল্লাহি… এটা কি করে হলো?”
মিতু তখনও মেঝেতে বসে আছে।
তার চোখে শূন্যতা।
মুখে কোনো শব্দ নেই।
মনে হচ্ছে যেন তার সমস্ত ভাষা কোথাও হারিয়ে গেছে।
বাড়িওয়ালা ধীরে ধীরে বললেন—
“পুলিশে খবর দিতে হবে। এই ঘটনা লুকিয়ে রাখা যাবে না।”
তাজুল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
তার চোখেও ভয়।
আর মিতুর মনে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
তার বোন কি সত্যিই নিজের ইচ্ছায় এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে?
নাকি…
কেউ তাকে এই পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছে?
ঘরের নীরবতার মধ্যে তখন যেন অদৃশ্য এক প্রশ্ন ভাসছে।
একটা প্রশ্ন—
যার উত্তর এখনো কেউ জানে না।
আর মিতু মেঝেতে বসে নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে ভাবছিল—
একটা থাপ্পর…
শুধু একটা থাপ্পরই কি এত বড় ঝড় ডেকে আনতে পারে?
নাকি এই ঝড়ের পেছনে লুকিয়ে আছে আরও গভীর কোনো অন্ধকার সত্য…
যেটা এখনো কেউ জানে না?
ঘরের বাতাস তখন ভারী হয়ে আছে শোক, ভয় আর অজানা আশঙ্কায়।
আর আফরিন—
সে নিঃশব্দে শুয়ে আছে বিছানার উপর।
যেন সব কষ্ট থেকে মুক্ত হয়ে এক অনন্ত ঘুমের দেশে চলে গেছে।
কিন্তু রেখে গেছে অসংখ্য প্রশ্ন…
যার উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই হয়তো বদলে যাবে অনেক মানুষের জীবন।
চলবে…