ঢাকা, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ১১:০৩:৩৮ PM

ক্ষমতা ও জনবিচ্ছিন্নতার জন্য আগাম সতর্কবার্তা

মান্নান মারুফ
20-04-2026 09:46:26 PM
ক্ষমতা ও জনবিচ্ছিন্নতার জন্য আগাম সতর্কবার্তা

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ২০২৪-২৫ পরবর্তী সময়কাল এক ক্রান্তিলগ্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার পর আওয়ামী লীগের নাটকীয় পতন এবং পরবর্তী সময়ে বিএনপির রাজনৈতিক উত্থান কেবল ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা ও ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের বহিঃপ্রকাশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিজ্ঞজনদের মতে, আওয়ামী লীগের পতনের মূলে ছিল অতি-আমলাতন্ত্র নির্ভরতা এবং তৃণমূল থেকে বিচ্ছিন্নতা। অন্যদিকে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকলেও বিএনপিকে তার ‘পরীক্ষিত’ কর্মীদের অবমূল্যায়ন ও অপপ্রচারের মতো জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

আমলাতন্ত্র ও পুলিশের অতি-নির্ভরতা

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের একটি প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে দলটির প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক শক্তি হ্রাস এবং প্রশাসনের ওপর অতিনির্ভরতা। শেষ কয়েক বছরে দলটি মাঠের কর্মীদের চেয়ে আমলা ও পুলিশ প্রশাসনের ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করেছিল।

  • জনবিচ্ছিন্নতা: যখন একটি রাজনৈতিক দল জনগণের ম্যান্ডেটের চেয়ে প্রশাসনের শক্তির ওপর ভর করে টিকে থাকতে চায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই জনগণের সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল।

  • সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর স্বীকারোক্তি: সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কোভিড মহামারির পর থেকে শেখ হাসিনার সঙ্গে মন্ত্রীদের সাক্ষাৎ ছিল অত্যন্ত সীমিত। এই প্রশাসনিক কঠোরতা ও ‘এক কেন্দ্রিক’ শাসনব্যবস্থা সরকারকে শেষ পর্যন্ত জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

পদবাণিজ্য ও চাঁদাবাজি

আওয়ামী লীগের ভেতরের পচন শুরু হয়েছিল নিচ থেকে। দলের ত্যাগী ও আদর্শিক নেতাদের পরিবর্তে জায়গা করে নিয়েছিল ‘সুবিধাবাদী’ গোষ্ঠী।

  • পদ কেনাবেচা: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগে পদ-পদবি কেনাবেচা বা অর্থের বিনিময়ে নেতা হওয়ার সংস্কৃতি মহামারি আকার ধারণ করেছিল। এর ফলে যারা রাজপথে লড়াই করা ত্যাগী কর্মী ছিল, তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

  • চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি: স্থানীয় পর্যায়ে নেতাদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। ড. মোমেনের ভাষায়, "টাকা দিলেই পদ পাওয়া যেত," যা দলটির নৈতিক ভিত্তি ধসিয়ে দিয়েছিল।

বৈদেশীক নীতি ও আনুগত্যের প্রশ্ন

আওয়ামী লীগ একটি বড় দল হওয়া সত্ত্বেও জনসমর্থনের চেয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতি তাদের অতিরিক্ত আনুগত্য ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশ্লেষকরা মনে করেন, জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বিশেষ কোনো রাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া জনগণের মধ্যে ভারত-বিরোধী সেন্টিমেন্ট বা দেশপ্রেমের জায়গা থেকে ক্ষোভ তৈরি করেছিল। এই ‘অনুগত সরকার’ তকমাটি দলটির জন্য শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়।

বিএনপির বর্তমান অবস্থা

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিএনপির  চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের হাল ধরেছেন শক্ত হাতে। তার নেতৃত্বের কিছু ইতিবাচক দিক ও সম্ভাবনা পরিলক্ষিত হচ্ছে:

  • কঠোর পরিশ্রম: তারেক রহমান বর্তমানে দৈনিক ১৬ ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় করছেন দেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে। তার এই পরিশ্রম দলের তৃণমূলের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

  • জনমুখী পরিকল্পনা: জনগণের মুখে হাসি ফোটানো এবং রাষ্ট্র সংস্কারের যে রূপরেখা তিনি প্রণয়ন করছেন, তা দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।

বিএনপির চ্যালেঞ্জ:ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার

ক্ষমতার হাতবদল হতে না হতেই বিএনপির বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের চেয়েও বেশি শত্রু বর্তমানে বিএনপির সক্রিয় রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

  • সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রোপাগান্ডা: সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকার ও বিএনপির বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা মিশ্রিত সমালোচনার ঝড় বইছে। এর মূল লক্ষ্য হলো জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং সরকারকে অস্থিতিশীল করা।দলটির জনপ্রিয়তা কমানোর কৌশল।

  • ভারতের সাথে সম্পর্কের অপপ্রচার : বিএনপিকে শেখ হাসিনার মতো ‘ভারতের অনুগত’ হিসেবে প্রমাণ করার একটি সংঘবদ্ধ চেষ্টা চলছে। যদি এই অপপ্রচার এখনই বন্ধ করা না যায়, তবে মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা সংকটে পড়তে পারে। ধর্মভীরু মানুষের কাছে অপছন্দের দল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

তৃণমূলের অসন্তোষ

বিজ্ঞজনদের মতে, ক্ষমতায় আসার বা প্রভাব বিস্তারের এই প্রাথমিক পর্যায়ে বিএনপি একটি কৌশলগত ভুল করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। যেমন:-

  • পরীক্ষিত কর্মীদের অবমূল্যায়ন: দীর্ঘ ১৭ বছর যারা রাজপথে মামলা-হামলার শিকার হয়ে সংগ্রাম করেছেন, তাদের পরিবর্তে কিছু ক্ষেত্রে ‘নতুন আসা’ বা ‘সুবিধাবাদী’ নেতাদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দলটির অনেক উচ্চপদস্থ নেতাকর্মীও মনে করছেন, ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন করা হলে তা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

  • অনিচ্ছায় যোগদান: অনেক নেতা বর্তমান হাওয়ায় গা ভাসাতে দলে আসছেন, যাদের প্রতি তৃণমূলের কোনো আস্থা নেই। এই "হাইব্রিড" নেতাদের আধিপত্য বাড়লে বিএনপির অবস্থাও আওয়ামী লীগের মতো হতে পারে। একটা সময় বিএনপির চেয়ে অন্যান্যদলের সমর্থকের সংখ্যা বেশি হতে পারে।

উত্তরণের পথ

আওয়ামী লীগের পতন থেকে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—জনবিচ্ছিন্নতা এবং ত্যাগী কর্মীদের অবমূল্যায়ন একটি দলের মৃত্যুর সমতুল্য। বিএনপি যদি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায় এবং জনগণের সেবা করতে চায়, তবে তাদের নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নিতে হবে। 

ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন: যারা দুর্দিনে দলের পাশে ছিল, তাদের যথাযথ সম্মান ও পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

অপপ্রচার রোধ: ভারতের প্রতি অতি-আনুগত্যের যে মিথ্যা বা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে, তা শক্তিশালী মিডিয়া সেলের মাধ্যমে যৌক্তিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।

জাতীয় স্বার্থ রক্ষা: বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘বন্ধুত্ব সবার সাথে, কিন্তু আনুগত্য কেবল দেশের জনগনের কাছে’—এই নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।

আমলাতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ: প্রশাসনকে শাসনের হাতিয়ার না বানিয়ে সেবার মাধ্যম দেশকে জনগনের দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

পরিশেষে, তারেক রহমানের নিরলস পরিশ্রম এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারলে বিএনপি একটি নতুন বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে। তবে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও হাইব্রিড নেতাদের দমনে ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক বিপর্যয় এড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।