ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৮:৫০:৩৮ PM

উপন্যাস:“শেষ দেখা”

মান্নান মারুফ
16-04-2026 02:36:28 PM
উপন্যাস:“শেষ দেখা”

পর্ব – ৬

রাত নেমেছে।

কিন্তু এই রাত শান্ত না।

আকাশের দিকে তাকালে মনে হয়—সেখানে আর তারা নেই, শুধু ভয়।

দূরে কোথাও একটার পর একটা বিস্ফোরণের শব্দ।

ধুম… ধুম… ধুম…

এই শব্দ এখন আর নতুন না।

মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

অভ্যস্ত—ভয়কে সঙ্গী করে বেঁচে থাকতে।

সামির সেলের ভেতর বসে।

তার চোখ খোলা।

ঘুম আসে না।

প্রতিটা বিস্ফোরণের শব্দ তার বুক কাঁপিয়ে দেয়।

সে জানে না—এই শব্দ কোথায় পড়ছে।

কিন্তু তার মনে শুধু একটাই ভয়—

“আম্মা…”

সে দেয়ালের সাথে মাথা ঠেকায়।

“তুমি ঠিক আছো তো?”

কেউ উত্তর দেয় না।

ইয়াসিনের কণ্ঠ,

ইয়াসিন পাশে বসে।

আজ সে লিখছে না।

সে শুধু শুনছে।

“তুই শুনতেছিস?”—সে কি যেন ফিসফিস করে বলল।

“হ…”—সামির উত্তর দিল।

“এখন শব্দেই বুঝা যায়… কোথায় পড়তেছে…”

এই কথাটা এত ঠাণ্ডা, এত বাস্তব—যেন ভয়ও ক্লান্ত হয়ে গেছে।

বাইরের পৃথিবী—আগুনের নিচে জীবন,একটা আবাসিক এলাকা।

অনেক  রাত।

হঠাৎ আকাশে আলো।

তারপর—

কিট শব্দ!

একটা ভবন কেঁপে উঠল।

মানুষ দৌড়াচ্ছে।

চিৎকার—

“বাঁচাও!”

“কেউ আছে?” সব শেষ হয়ে গেল?

ধোঁয়া, ধুলা, আর ভাঙা দেয়ালের নিচে আটকে পড়া মানুষের শব্দ।

একজন বাবা ইট সরাচ্ছে—

“আমার মেয়েটা ভিতরে!”

তার হাত কেটে গেছে।

রক্ত পড়ছে।

কিন্তু সে থামছে না।

একটা ছোট হাসপাতাল।

আহত মানুষে ভরা।

ডাক্তাররা দৌড়াচ্ছে।

একজন নার্স চিৎকার করছে—
“আর জায়গা নাই!”

একটা ছোট ছেলে কাঁদছে—
“আম্মা… আম্মা…”

তার পাশে কেউ নেই।

হঠাৎ বাইরে আবার শব্দ।

সবাই থেমে গেল।

এক সেকেন্ড।

দুই সেকেন্ড।

তারপর—

আরেকটা বিস্ফোরণ।

হাসপাতালের কাঁচ কেঁপে উঠল।

কেউ বলল—
“এখানেও নিরাপদ না…”

নাজওয়া এখন একা।

তার ঘরে আর কোনো শব্দ নেই।

মেয়ের হাসি নেই।

ছেলের ডাক নেই।

শুধু দেয়াল।

আর নীরবতা।

তিনি মাঝে মাঝে নিজের সাথে কথা বলেন।

“তুই আসবি… না?”

কিন্তু তিনি জানেন—
কেউ উত্তর দেবে না।

একদিন…

তিনি বাইরে বসে ছিলেন।

হঠাৎ পাশের এক মহিলা এসে বলল—
 আবার শুরু হইছে…”

নাজওয়া মাথা তুললেন।

তার চোখে ভয় নেই।

কারণ তার ভেতরে আর কিছু বাকি নেই।

আকাশ থেকে আগুন,

আকাশে শব্দ।

তারপর আলো।

তারপর—

ধাম!

মাটি কেঁপে উঠল।

মানুষ দৌড়াচ্ছে।

কেউ লুকাচ্ছে।

কেউ চিৎকার করছে।

নাজওয়া দাঁড়িয়ে।

তিনি দৌড়ান না।

তিনি শুধু তাকিয়ে থাকেন।

কারণ তিনি ভাবেন—

“আর কী হারানোর আছে?”

কারাগারের ভেতরে প্রতিধ্বনি

সামির হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।

“আমি বাইরে যাইতে চাই!”

সে চিৎকার করল।

“আমার আম্মা একা!”

সৈনিক দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে।

কিছু বলে না।

কারণ এই চিৎকার—
প্রতিদিনের।

 রাতে সামির মোটেই ঘুমাতে পারে না।

সে দেয়ালে হাত দেয়।

“আম্মা!”

তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে।

ইয়াসিন তাকে ধরে—

“শান্ত হ…”

“আমি পারতেছি না…”

সামির কাঁদছে।

এই কান্না—
অনেকদিন জমে থাকা কান্না।

একটি খবর,

কয়েকদিন পর—

একজন নতুন বন্দী এলো।

সে ক্লান্ত।

তার চোখ লাল।

সামির এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল—

“বাইরের খবর কী?”

ছেলেটা চুপ করে রইল।

তারপর আস্তে বলল—

“অনেক জায়গা ধ্বংস…”

সামিরের বুক কেঁপে উঠল—

“এই এলাকার নাম কী?”

ছেলেটা একটা নাম বলল।

সামির স্থির হয়ে গেল।

ওটাই তার এলাকা।

সেই রাত।

নাজওয়া তার ঘরে বসে।

হঠাৎ আবার বিস্ফোরণ।

এইবার খুব কাছে।

তার ঘরের দেয়াল কেঁপে উঠল।

তিনি উঠে দাঁড়ালেন।

“আবার?”

তিনি দরজার দিকে হাঁটলেন।

ঠিক তখন—

আরেকটা বিস্ফোরণ।

সবকিছু অন্ধকার।

ধুলা।

নীরবতা।

কারাগারের ভেতরে—

সামির দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে।

তার চোখ ফাঁকা।

সে ফিসফিস করে—

“আম্মা… আমি আসতেছি…”

বাইরে—

ধ্বংসস্তূপ। কেউ কেউ ধ্বংসস্তূপের ভিতরে

মানুষ খুঁজছে।

কেউ একজন বলল—

“এইখানে একজন ছিল…”

ইট সরানো হলো।

একটা হাত দেখা গেল।

স্থির।

নড়ছে না।

নীরবতা,

এইবার কোনো চিৎকার নেই।

নেই কোনো আর্তনাদ ।

কারণ কখনো কখনো—
কান্নাও থেমে যায়।

এই পৃথিবীতে কিছু ভাঙন আছে—
যা শুধু ঘর ভাঙে না,
মানুষকেও ভেঙে দেয়।

কিছু যুদ্ধ আছে—
যেখানে কেউ জেতে না,
সবাই হারে।

আর কিছু গল্প আছে—
যেখানে মা ডাকলেও
কেউ আর সাড়া দেয় না।

চলবে.....