ঢাকা, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৪:৪৪:৩৮ PM

উপন্যাস:“লুচ্চা”

মান্নান মারুফ
12-04-2026 02:13:04 PM
উপন্যাস:“লুচ্চা”

 পর্ব: ১

কোনো এক আপনজন হঠাৎ করেই কুদ্দুছকে “লুচ্চা” বলে বসে। তার মতে, পুরুষ মানেই নাকি লুচ্চা। কথাটা শুনে যেন আকাশ ভেঙে পড়ে কুদ্দুছের মাথায়। জীবনে কখনও এমন অভিযোগ তার কানে আসেনি। সে নিজেও বিশ্বাস করতে পারে না—সে লুচ্চা!

প্রেম-ভালোবাসা তো প্রতিটি মানুষের জীবনেই আসে। কুদ্দুছের জীবনেও এসেছিল। সে প্রেম করেছিল, গভীরভাবে। কিন্তু সেই প্রেম এখন মৃত—একটা স্মৃতি, একটা শূন্যতা। তবুও কুদ্দুছ ভালোবাসতে জানে। যাকে ভালোবাসে, তাকে মন-প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসে।

কুদ্দুছের জীবন যেন সরলতার এক নিঃশব্দ দলিল। ছোটবেলা থেকেই সে এমন—চুপচাপ, একটু লাজুক, নিজের মতো করে থাকা এক মানুষ। পাড়ার কেউ কখনও তাকে নিয়ে খারাপ কিছু বলেনি। বরং সবাই বলত, “কুদ্দুছ ছেলে ভালো, একটু বোকাসোকা টাইপের, কিন্তু মনটা একদম পরিষ্কার।”

এমনকি তার শত্রুও ছিল না বললেই চলে। কারণ, কুদ্দুছ কখনও এমন কিছু করেনি, যাতে কারও মনে আঘাত লাগে। তার জীবনে একটাই বড় দোষ ছিল—সে খুব সহজে ভালোবেসে ফেলে। আর সেই ভালোবাসা সে নিজের মধ্যে এমনভাবে লালন করে, যেন সেটা পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র কিছু।

তবুও আজ তার জীবনে এক অদ্ভুত শব্দ ঢুকে পড়েছে—“লুচ্চা”।

শব্দটা তার কানে প্রথম যখন আসে, সে যেন বিশ্বাসই করতে পারেনি। তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল। মনে হয়েছিল, কেউ যেন তার সারা জীবনের সততা, ভালোবাসা আর নির্দোষতাকে এক মুহূর্তেই মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিল।

আর সবচেয়ে বড় কথা—এই শব্দটা বলেছে সেই মানুষটা, যাকে কুদ্দুছ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।

সেদিন বিকেলটা ছিল অন্য দিনের মতোই। আকাশে হালকা মেঘ, বাতাসে একটা নরম শীতলতা। কুদ্দুছ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল, হাতে একটা পুরনো ডায়েরি। ডায়েরিটা তার খুব প্রিয়—কারণ সেখানে সে তার সব না-বলা কথাগুলো লিখে রাখে।

আজ সে অপেক্ষা করছিল—তার জন্য।

মেহরিন।

নামটা মনে আসতেই কুদ্দুছের চোখে এক অদ্ভুত কোমলতা ভেসে ওঠে। মেহরিন তার জীবনের এমন এক অধ্যায়, যেটা সে কখনও খুলে বলতে পারেনি, আবার বন্ধও করতে পারেনি।

মেহরিনকে সে প্রথম দেখেছিল কলেজের গেটে। সাদা ওড়না, নীল সালোয়ার কামিজ, চুলগুলো হালকা বাতাসে উড়ছিল। সেই দৃশ্যটা যেন তার চোখে গেঁথে গিয়েছিল। সেই দিন থেকেই কুদ্দুছের ভেতরে এক অদ্ভুত পরিবর্তন শুরু হয়।

সে বুঝতে পারে—এটাই ভালোবাসা।

কিন্তু কুদ্দুছের ভালোবাসা ছিল একতরফা। সে কখনও মেহরিনকে কিছু বলেনি। শুধু দূর থেকে দেখেছে, তার হাসি ,তার হাটাচলা,কথা বলা, তাকে বুঝতে চেষ্টা করেছে কুদ্দুছ।

অনেক সময় সে মেহরিনের পিছু পিছু হাঁটত, কিন্তু কখনও এমন দূরত্ব অতিক্রম করত না, যেটা অশোভন মনে হতে পারে। তার কাছে এটা ছিল নিরাপত্তা—মেহরিন যেন একা না থাকে, যেন কেউ তাকে কষ্ট না দেয়। কেউ যেন তার সাথে খারাপ আচারন না করে।

কিন্তু এই নীরব ভালোবাসাটাই একদিন ভুল বোঝাবুঝির কারণ হয়ে দাঁড়াল।

সেদিন কুদ্দুছ একটু বেশি সাহস করেছিল। মেহরিনের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার বুক ধড়ফড় করছিল, হাত কাঁপছিল। তবুও সে ঠিক করেছিল—আজ কিছু একটা বলবেই।

“মেহরিন…”

তার কণ্ঠে কাঁপন ছিল।

মেহরিন ঘুরে তাকাল। তার চোখে বিস্ময়, একটু বিরক্তিও।

“আপনি আমাকে ফলো করেন কেন?”

প্রশ্নটা এমনভাবে এল, যেন সেটা অনেকদিনের জমে থাকা অভিযোগ।

কুদ্দুছ হতভম্ব হয়ে গেল। সে বুঝতেই পারছিল না কী বলবে।

“না… মানে… আমি তো…”

তার কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছিল।

মেহরিন একটু এগিয়ে এসে বলল,
“আপনি ভাবেন আমি বুঝি না? প্রতিদিন আমার পেছনে পেছনে আসেন। এটা কী?”

কুদ্দুছের চোখে অসম্ভব কষ্ট পাওয়ার ছাপ। সে বলতে চাইল—“আমি আপনাকে ভালোবাসি, তাই আপনাকে দেখি।” কিন্তু এটা বলার, সেই সাহস তার হলো না।

বরং সে শুধু বলল,
“আমি খারাপ কিছু চাইনি…”

মেহরিন হঠাৎ হেসে উঠল, কিন্তু সেই হাসিতে ছিল তাচ্ছিল্য।

“সবাই এটাই বলে। আপনি একটা লুচ্চা ছাড়া কিছু না।”

শব্দটা যেন আকাশ ভেঙে পড়ার মতো।

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল, চারপাশের সব শব্দ বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু ওই একটা শব্দ বারবার তার কানে বাজছে—“লুচ্চা… লুচ্চা…”

সে আর কিছু বলতে পারল না। শুধু ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল।

সেই দিনটার পর কুদ্দুছ আর আগের মতো থাকল না।

সে নিজের ঘরে বসে ডায়েরির পাতা খুলল। হাত কাঁপছিল, তবুও সে লিখতে শুরু করল—

“আমি কি সত্যিই লুচ্চা?
আমি কি ভুল করেছি?
ভালোবাসা কি অপরাধ?”

তার চোখের পানি পাতার ওপর পড়ে দাগ তৈরি করছিল।

সে মনে করতে লাগল, তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত—কোথাও কি সে এমন কিছু করেছে, যেটা লুচ্চামির মধ্যে পড়ে?

না, সে কখনও কারও দিকে খারাপ দৃষ্টিতে তাকায়নি। কখনও কারও সম্মান নিয়ে খেলেনি। তার ভালোবাসা ছিল নিঃস্বার্থ, নিরব, একান্ত নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

তাহলে কেন এই অভিযোগ?

পাড়ার মানুষজন এখনও তাকে আগের মতোই দেখে। কেউ জানে না, তার ভেতরে কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

তার মা মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করেন,
“তুই এত চুপচাপ কেন রে?”

কুদ্দুছ শুধু হাসে। বলে, “কিছু না মা।”

কিন্তু সেই হাসির ভেতরে যে কতটা ভাঙা কষ্ট লুকিয়ে আছে, সেটা কেউ বুঝতে পারে না।

একদিন রাতে সে ছাদে উঠে বসেছিল। আকাশে অনেক তারা। সে তাকিয়ে রইল, যেন উত্তর খুঁজছে।

“আমি যদি লুচ্চা না হই, তাহলে সে আমাকে এমন বলল কেন?”

প্রশ্নটা যেন কুদ্দুছকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।

তার মনে হলো—সম্ভবত ভালোবাসার প্রকাশটাই ভুল ছিল। হয়তো তার নীরব উপস্থিতি, দূর থেকে অনুসরণ করা—এসব মেহরিনের কাছে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সে বুঝতে পারল—ভালোবাসা শুধু অনুভব করলেই হয় না, সেটাকে সঠিকভাবে প্রকাশ করাও জরুরি।

কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

কুদ্দুছ সিদ্ধান্ত নিল—সে আর কখনও মেহরিনের সামনে যাবে না। তাকে দূর থেকেই ভালোবাসবে, কিন্তু আর কোনোদিন তাকে অস্বস্তিতে ফেলবে না।

তবুও, তার মন মানতে চায় না।

কারণ, ভালোবাসা এমন এক জিনিস—যেটা যুক্তির কথা শোনে না।

ডায়েরির শেষ পাতায় সে লিখল—

“আমি লুচ্চা নই।
আমি শুধু একজন মানুষ, যে খুব বেশি ভালোবেসে মানুষকে।
হয়তো এটাই তার অপরাধ।”

তারপর সে কলমটা বন্ধ করে রাখল।

আকাশে তখন চাঁদ উঠেছে। সেই চাঁদের আলোয় কুদ্দুছের মুখটা আরও ফ্যাকাশে লাগছিল।

তার জীবনের গল্প এখন এক নতুন মোড় নিতে চলেছে—যেখানে ভালোবাসা, ভুল বোঝাবুঝি আর আত্মসম্মানের লড়াই একসাথে জড়িয়ে যাবে।

আর সেই লড়াইয়ের শুরুটা হলো একটি শব্দ দিয়ে—

“লুচ্চা”।

(চলবে…)