ঢাকা, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
সময়: ০৩:৩৬:২১ PM

অশান্ত মানিকগঞ্জ:চলছে হত্যা, ধর্ষণ ও মব

ষ্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
10-06-2026 03:36:21 PM
অশান্ত মানিকগঞ্জ:চলছে হত্যা, ধর্ষণ ও মব

শান্ত জেলা হিসেবে পরিচিত মানিকগঞ্জে গত দুই সপ্তাহে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, মব ভায়োলেন্স ও কিশোর গ্যাং-সংক্রান্ত ঘটনায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতিতে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও হতাশা বিরাজ করছে।সদর, ঘিওর, দৌলতপুর, হরিরামপুর, সিংগাইর ও শিবালয় উপজেলায় সংঘটিত এসব ঘটনায় নৃশংস হত্যাকাণ্ড, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও গণপিটুনির মতো অপরাধের চিত্র উঠে এসেছে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, অধিকাংশ অপরাধের পেছনে সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়, নৈতিকতার চরম অবনতি এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাব দায়ী।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের ২২ মে থেকে ৯ জুন পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিকভাবে মব ভায়োলেন্স, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ হত্যার ক্ষেত্রেই গণপিটুনি বা জনতার বিচারপ্রবণতার বিষয়টি সামনে এসেছে।

এদিকে জেলা শহর, উপজেলা সদর ও গ্রামাঞ্চলে কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য ক্রমেই বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে।

ধর্ষণের ঘটনা

শিবালয় উপজেলার দক্ষিণ তেওতা এলাকায় ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহকারী এক বৃদ্ধাকে গত ৩০ মে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে আশরাফুল (২৬) ও রবিন ওরফে সোহেল রানা (২৭) নামে দুই যুবকের বিরুদ্ধে। এ সময় ভুক্তভোগীর গলায় থাকা প্রায় এক ভরি ওজনের রুপার চেইনও ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে ভুক্তভোগী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে। ছিনতাই হওয়া চেইন কেনার অভিযোগে স্বর্ণকার নিতাই চন্দ্রকেও গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

অন্যদিকে, গত ৬ জুন রাতে স্বামীর সঙ্গে পাবনায় যাওয়ার পথে ঘিওর উপজেলার পয়লা ইউনিয়নের ছোট নিলুয়া এলাকায় এক নারীকে (২৫) তার স্বামীর সামনেই পার্শ্ববর্তী একটি নির্জন বাগানে নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। স্থানীয়রা টের পেলে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী ঘিওর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেছেন।

কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের কুমেরপাড়া এলাকায় গত ৩০ মে উচ্চ শব্দে মোটরসাইকেল চালানোকে কেন্দ্র করে দুই কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, এক পক্ষ অপর পক্ষকে মোটরসাইকেল থামিয়ে মারধর ও অগ্নিসংযোগ করে। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। বিষয়টি জেলার বিভিন্ন উপজেলার অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

মাদকবিরোধী প্রতিবাদে হামলা

গত ১ জুন সন্ধ্যায় সিংগাইর উপজেলার বায়রা জজবাড়ী এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তিন যুবকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, সাব্বির নামে এক মাদক কারবারি ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদের কুপিয়ে গুরুতর জখম করে।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনা

গত ২২ মে সিংগাইর উপজেলার জয়মন্টব মাছ বাজার এলাকায় মাত্র ১০ টাকার পাওনা নিয়ে এক পান বিক্রেতার সঙ্গে ক্রেতার বাগবিতণ্ডা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, এ সময় ক্রেতা ইসা মোল্লা পান বিক্রেতা শ্রীবাস চন্দ্র সাহাকে (৫৫) গলাটিপে ধরেন ও মারধর করেন। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। নিহত শ্রীবাস সাহা দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় পান বিক্রি করতেন। তবে এখনো এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। নিহতের ছেলে দীপ্ত সাহা ভয়ের কারণে মামলা করতে সাহস পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন।

সদর উপজেলার কাটিগ্রাম এলাকায় ২৪ মে রাতে পারিবারিক কলহের জেরে রিপন মিয়া নামে এক যুবক তার মামি সাথী আক্তারকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন। ঘটনার পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস দেন এবং পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

৩০ মে গভীর রাতে সদর উপজেলার পুটাইল ইউনিয়নে সজীব মিয়া (২৯) নামে এক যুবককে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে এবং দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

দৌলতপুর উপজেলার বাচামারা ইউনিয়নের ফকিরপাড়া এলাকায় সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে ছোট ভাই ইউসুফ আলী ধারালো অস্ত্র দিয়ে বড় ভাই আব্দুস সালাম, ভাবি আমেনা বেগম ও ভাতিজা আসাওয়াদকে কুপিয়ে আহত করেন। পরে আমেনা বেগম ও আসাওয়াদের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ইউসুফ আলীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

সিংগাইর উপজেলার জিয়ানগর এলাকায় ৭ জুন মধ্যরাতে চুরির সময় ধরা পড়ে রাজিব নামে এক ব্যক্তি। স্থানীয়দের গণপিটুনিতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি।

হরিরামপুর উপজেলার মধ্য ধোবুরীয়া এলাকায় গত ৯ জুন পারিবারিক কলহের জেরে মানসিক ভারসাম্যহীন রোকেয়া বেগম (৬০) তার মা রিজিয়া বেগমকে (৯৮) বঁটি দিয়ে আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে পুলিশ রোকেয়া বেগমকে গ্রেপ্তার করে।

যা বলছেন বিশিষ্টজনেরা

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল হোসেন কচি বলেন, সারাদেশের মতো মানিকগঞ্জেও মব ভায়োলেন্স উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাহীনতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও গণপিটুনির মতো অপরাধকে উৎসাহিত করছে। একই সঙ্গে পারিবারিক অবক্ষয় ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

মানিকগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মেজবাউল হক মেজবা বলেন, কিশোর গ্যাং ও মব কালচারের বিস্তার রোধে অভিভাবকদের সচেতনতা ও সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের অপরাধপ্রবণ করে তুলছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত আক্রোশ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যেন নিরপরাধ মানুষ গণপিটুনির শিকার না হন, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।

সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মশিউর রহমান সিদ্দিকী বলেন, সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ায় মানুষ ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার নতুন প্রজন্মকে সৃজনশীল কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, যা তাদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর পাশাপাশি নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ও অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

পুলিশের বক্তব্য

মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “চোর বা ডাকাত যেই হোক, তাকে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে হত্যা করা যাবে না। অপরাধীকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দিতে হবে।”

তিনি জানান, জেলার বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন ও আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে। দৌলতপুরে ভাবি-ভাতিজা হত্যা, সদরের পুটাইলে গণপিটুনিতে হত্যা এবং হরিরামপুরে মাকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শিবালয়ে ভিক্ষুককে ধর্ষণের মামলার আসামিদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ছিনতাই হওয়া গহনাও উদ্ধার করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হবে। অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তোলাও জরুরি।”