ঢাকা, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১০:০৬:৫৫ PM

পদায়ন বিতর্কে ডেপুটি রেঞ্জার নাজমুল

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
22-07-2026 08:34:45 PM
পদায়ন বিতর্কে ডেপুটি রেঞ্জার নাজমুল

সুন্দরবন থেকে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, বগুড়া হয়ে সর্বশেষ কুমিল্লার সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশন—প্রায় দুই দশকের চাকরিজীবনে বন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ও আর্থিকভাবে লাভজনক হিসেবে পরিচিত একের পর এক কর্মস্থলে পদায়ন পেয়েছেন ডেপুটি রেঞ্জার মো. নাজমুল হাসান। চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে বনজ সম্পদ পাচারে সংশ্লিষ্টতা, ঘুষ বাণিজ্য, বদলি নীতিমালা লঙ্ঘন, সরকারি সম্পত্তি দখলে সহযোগিতা এবং প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের পরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি কুমিল্লার সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনে কাঠবোঝাই একটি ট্রাক ছাড়িয়ে দিতে ঘুষের দর-কষাকষির একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর বন বিভাগের অভ্যন্তরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এত গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরও কেন তাঁর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? একই সঙ্গে অতীতে ওঠা অভিযোগগুলো কখনো কার্যকরভাবে তদন্ত করা হয়েছিল কি না, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।

বন বিভাগের বদলি আদেশ, সংশ্লিষ্ট নথি এবং বর্তমান ও সাবেক একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নাজমুল হাসানের চাকরিজীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে বন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ও লোভনীয় কর্মস্থলগুলোতে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, একাধিক পদায়নের ক্ষেত্রে প্রচলিত বদলি নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি।

নথি অনুযায়ী, বগুড়া সার্কেলে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁকে পুনরায় চট্টগ্রাম সার্কেলে পদায়ন দেওয়া হয়। পরে চট্টগ্রাম সার্কেলেও নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগের অধীন সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনে বদলি করা হয়। বদলি নীতিমালায় নির্ধারিত সময় পূরণের বিধান থাকলেও তাঁর ক্ষেত্রে তা কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ও লোভনীয় পদায়নকে কেন্দ্র করে প্রভাব ও অর্থ লেনদেনের একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। তাঁদের দাবি, নাজমুল হাসানের সর্বশেষ সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনে পদায়নের ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো স্বাধীন তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, চাকরিজীবনের শুরুতে সুন্দরবনে কর্মরত থাকাকালে নাজমুল হাসান তৎকালীন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ওই সময় তাঁর বিরুদ্ধে বনজ সম্পদ পাচার-সংক্রান্ত অভিযোগ ওঠে। পরে চট্টগ্রাম সার্কেলের দক্ষিণ চট্টগ্রামের পদুয়া ফরেস্ট চেক স্টেশনে দায়িত্ব পালনকালে দক্ষিণ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবান অঞ্চলে বনজ সম্পদ পাচারের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার অভিযোগও উঠে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো বিভাগীয় শাস্তির তথ্য পাওয়া যায়নি।

পরবর্তীতে বান্দরবান পাল্পউড প্ল্যান্টেশন বিভাগ এবং বান্দরবান বন বিভাগে তাঁর পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। একাধিক কর্মকর্তার দাবি, প্রচলিত বদলি নীতিমালার বাইরে প্রভাব খাটিয়ে এসব পদায়ন নেওয়া হয়েছিল। একই সময়ে সাংগু ও মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে বনজ সম্পদ পাচারের অভিযোগও সামনে আসে। তবে এসব অভিযোগেও তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে তাঁকে বগুড়া সার্কেলে বদলির আদেশ দেওয়া হলে তিনি প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। পরে মামলা খারিজ হওয়ার পর সেখানে যোগদান করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বগুড়ায়ও তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বনায়ন প্রকল্পে দায়িত্ব পান। তবে দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁকে আবার চট্টগ্রাম সার্কেলে ফিরিয়ে আনা হয়।

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে কর্মরত অবস্থায়ও তাঁর বিরুদ্ধে বনজ সম্পদ পাচার এবং সরকারি জমি দখলে সহযোগিতার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে আবার বান্দরবান হয়ে সর্বশেষ কুমিল্লার সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনে পদায়ন পান তিনি।

এদিকে, সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনে ঘুষের দর-কষাকষির অডিও ভাইরাল হওয়ার পর নাজমুল হাসানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন এবং সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনের কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার মো. নাজমুল হাসানের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।