ঢাকা, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৫:২৩:৩২ AM

২০০ কোটির সরকারি জমি হাউজিংয়ের দখলে

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
18-07-2026 09:22:34 PM
২০০ কোটির সরকারি জমি হাউজিংয়ের দখলে

রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালসংলগ্ন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) ১.০৮৪০ একর সরকারি জমি দীর্ঘদিন ধরে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের দখলে রয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। যানজট নিরসনে জমিটি উদ্ধার করে অস্থায়ীভাবে মহাখালী বাস টার্মিনালের নামে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে (ডিএনসিসি) চিঠি দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ।

টার্মিনালে জায়গার সংকট

মহাখালী বাস টার্মিনালে ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বাস চলাচল করায় দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র জায়গার সংকট রয়েছে। ফলে চালকেরা বাধ্য হয়ে মূল সড়কে বাস পার্কিং করেন। এতে মহাখালী ফ্লাইওভার, আমতলী ও গুলশান লিংক রোডে প্রতিদিন দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।

অথচ টার্মিনালের পাশেই সওজের বিশাল সরকারি জমি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

সরকারি নথিতে যা রয়েছে

সরকারি নথি অনুযায়ী, মহাখালী বাস টার্মিনালের পূর্ব পাশে মোট ৩.৪১৩২ একর জমির মধ্যে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বৈধ মালিকানাধীন জমির পরিমাণ ১.৭৫ একর। কিন্তু বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২.৮ একর জমি ব্যবহার করছে।

অন্যদিকে, সওজের রেকর্ড অনুযায়ী তাদের জমির পরিমাণ ১.৬০৮৮ একর হলেও বর্তমানে তাদের দখলে রয়েছে মাত্র ০.৫২৪৮ একর। অর্থাৎ অবশিষ্ট ১.০৮৪০ একর জমি ইস্টার্ন হাউজিংয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

একই এলাকায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ০.০৫৪৪ একর জমি অবশ্য তাদের নিজস্ব দখলেই রয়েছে।

জমির বাজারমূল্য

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সহসভাপতি (অর্থ) হারুন অর রশিদ বলেন,

"তেজগাঁও-মহাখালী এলাকায় বর্তমানে প্রতি কাঠা জমির মূল্য ২ থেকে ৪ কোটি টাকা। গড়ে প্রতি কাঠা ৩ কোটি টাকা হিসেবে হিসাব করলে দখলকৃত জমিটির বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা।"

সরকারি জমিতে গ্যারেজ ও স্টোরেজ

সরেজমিনে দেখা যায়, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড ও ডিএনসিসি হাসপাতালসংলগ্ন ওই জমিতে ইস্টার্ন হাউজিং তাদের আবাসন প্রকল্পের নির্মাণসামগ্রী সংরক্ষণ এবং যানবাহনের গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহার করছে। সেখানে একতলা কয়েকটি ভবন রয়েছে, যা স্টাফদের আবাসন ও অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের চিঠির পর মহাখালী বাস মালিক সমিতি বাসস্ট্যান্ডের দেয়াল ভেঙে জমিটির একাংশ নিজেদের দখলে নিয়ে বাসস্ট্যান্ডের সঙ্গে একীভূত করার কাজ শুরু করেছে। প্রায় এক মাস ধরে সেখানে মাটি ভরাটের কাজ চলছে।

ইস্টার্ন হাউজিংয়ের মেকানিক্যাল বিভাগের কর্মকর্তা সামিউল আহসান বলেন,

"আগে এখানে আমাদের মালামাল রাখা হতো। প্রায় এক মাস আগে বাসস্ট্যান্ডের লোকজন জায়গাটির দখল নেয়।"

প্রতিষ্ঠানটির আরেক কর্মচারী বলেন,

"আমি ৩৩ বছর ধরে এখানে চাকরি করছি। শুরু থেকেই জায়গাটি স্টোরেজ ও গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখেছি। আগে জানতাম এটি ইস্টার্ন হাউজিংয়ের জমি, এখন শুনছি এটি সওজের।"

ডিএনসিসির বক্তব্য

ডিএনসিসির পরিবহন ব্যবস্থাপক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মেহেদী হাসান বলেন,

"জায়গাটির মালিক আমরা নই। তাই সেখানে আমাদের কোনো উন্নয়নকাজ পরিচালনার সুযোগ নেই। পুলিশের চিঠি পাওয়ার পর বিষয়টি সম্পত্তি বিভাগে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে বাস মালিক সমিতি নিজেদের উদ্যোগে জায়গাটি উন্নয়ন করছে।"

বাস মালিক সমিতির দাবি

মহাখালী বাস মালিক সমিতির সভাপতি এবং একতা পরিবহনের মালিক সিরাজুল ইসলাম সিরাজ বলেন,

"১৫-২০ দিন আগে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের উপস্থিতিতে জমি মাপজোক করা হয়েছে। কিছু অংশ ছেড়ে দেওয়া হলেও এখনও দেড় বিঘারও বেশি জমি তাদের দখলে রয়েছে। তারা ৪-৫ দিনের মধ্যে জায়গা খালি করার কথা বলেছিল, কিন্তু এখনো করেনি।"

সওজের জমিতে বাস মালিক সমিতির উন্নয়নকাজ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,

"টার্মিনালের উন্নয়নের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। কিন্তু সওজ এখনো জমি হস্তান্তর না করায় তারা কাজ করছে না। তাই বাধ্য হয়ে আমরাই উন্নয়ন করছি।"

তিনি আরও বলেন,

"আগে মহাখালী টার্মিনালে বাস ছিল প্রায় ৪৫০টি। এখন সংখ্যা বেড়ে ১,৪০০ হয়েছে। এত বাস রাখার জায়গা নেই। বাসের লাইসেন্স দেওয়ার সময় নিজস্ব ডিপো থাকার শর্ত থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ পরিবহনের কোনো ডিপো নেই। সরকার যদি পুরো জমি উদ্ধার করে উন্নয়ন করে, তাহলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে।"

যানজট কমাতে সরকারের পরিকল্পনা

মহাখালীর যানজট স্থায়ীভাবে কমাতে সরকার দূরপাল্লার বাস পূর্বাচল, হেমায়েতপুর, কাঁচপুর ও কেরানীগঞ্জের বাঘৈরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মহাখালী, গাবতলী ও সায়েদাবাদ টার্মিনাল কেবল রাজধানীর অভ্যন্তরীণ বাসের টার্মিনাল বা ডিপো হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

তবে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ গত ১৯ মে ডিএনসিসির প্রশাসকের কাছে চিঠি দিয়ে সওজের বেদখল জমিসহ আশপাশের সরকারি জমি উদ্ধার করে অস্থায়ীভাবে বাস টার্মিনালের নামে বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, জায়গার সংকটের কারণে চালকেরা মূল সড়কে বাস পার্কিং করছেন। অব্যবহৃত সরকারি জমি উদ্ধার করে টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করা হলে যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন,

"আমাদের কাছে তথ্য ছিল যে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের আশপাশে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার জমি অব্যবহৃত ও কিছু ক্ষেত্রে অবৈধ দখলে রয়েছে। নথিপত্র যাচাই করে আমরা ডিএনসিসিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছি।"

সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের অভাব

ডিএমপির চিঠির পরও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে। এই সুযোগে বাস মালিক সমিতি জমির একাংশ নিজেদের উদ্যোগে উন্নয়ন করে বাস ডিপো হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছে।

ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা ও পরিবহন মহাব্যবস্থাপক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ শওকত ওসমান বলেন,

"দূরপাল্লার বাসের জন্য ঢাকার বাইরে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত রয়েছে। সওজের জমি বর্তমান টার্মিনালের সঙ্গে একীভূত করা হবে কি না, সেটিও সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়।"

এ বিষয়ে সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মইনুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বক্তব্য

সরকারি জমি দখলের অভিযোগ সম্পর্কে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিদ্দিক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে পরে প্রতিষ্ঠানটির নগর পরিকল্পনাবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,

"মহাখালীর ওই জমি নিয়ে বাস মালিক সমিতির সঙ্গে আমাদের সমঝোতা হয়েছে। জায়গাটির মালিক আমরাই। দীর্ঘদিন কাগজপত্র হালনাগাদ না হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। এখন বিষয়টির সমাধান হয়েছে।"

তবে জায়গাটি যদি ইস্টার্ন হাউজিংয়ের মালিকানাধীন হয়, তাহলে বাস মালিক সমিতি কীভাবে সেখানে উন্নয়নকাজ চালাচ্ছে—এ প্রশ্নের কোনো সরাসরি উত্তর তিনি দেননি।