ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৩:০৬:২০ AM

নিরীহ মানুষ যেন হয়রানি না হয় দুদকে

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
15-07-2026 05:29:51 PM
নিরীহ মানুষ যেন হয়রানি না হয় দুদকে

বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার প্রধান দায়িত্ব পালন করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিভিন্ন সময়ে এই সংস্থার কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিরীহ মানুষকে হয়রানি এবং তদন্তকে প্রভাবিত করার মতো অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব ঘটনা দুদকের কার্যক্রম নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

দুদকের মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি এবং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত অভিযোগ থেকে জানা যায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল অভিযুক্ত ব্যক্তির পাশাপাশি এমন ব্যক্তিদেরও মামলায় জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ নেই। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত বা চার্জশিটে নাম অন্তর্ভুক্ত করার ভয় দেখিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি দালালের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে থাকে। যদিও এসব অভিযোগের অধিকাংশই আদালতে প্রমাণিত হয়নি, তবুও এ ধরনের অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

অনেক ভুক্তভোগীর দাবি, তদন্তের নামে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা এবং চার্জশিট দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। এসব কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পান না। কারণ, তাদের আশঙ্কা থাকে যে অভিযোগ করলে মামলার তদন্ত আরও জটিল হতে পারে অথবা তারা নতুন করে হয়রানির শিকার হতে পারেন। ফলে মামলার আসামি থেকে শুরু করে নিরপরাধ ব্যক্তি—অনেকেই ভয়ের কারণে নীরব থাকেন।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, দুদকের সব কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে একই দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। বরং অধিকাংশ কর্মকর্তা সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। কিছু অসাধু কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকেই এ অবস্থাকে "এক বালতি দুধে এক ফোঁটা চোনা পড়ার" সঙ্গে তুলনা করেন। তাদের প্রত্যাশা, দুদকের সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবেন এবং নিরপরাধ মানুষ যেন কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

দুদকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মিজানুর রহমানকে ঘিরে তদন্ত। ওই ঘটনায় দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে এবং দুর্নীতি দমনকারী প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করে।

তবে ওই ঘটনার ইতিবাচক দিকও ছিল। অভিযোগ ওঠার পর দুদক নিজস্ব ব্যবস্থায় তদন্ত পরিচালনা করে এবং তদন্তের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত খন্দকার এনামুল বাছির ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান—উভয়েই আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তির আওতায় আসেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও সেগুলোর তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতা দুদকের রয়েছে।

অন্যদিকে, দুদকের সাবেক কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিনের ঘটনাও ব্যাপক আলোচিত হয়। রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতির তদন্ত করে তিনি আলোচনায় আসেন। পরবর্তীতে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হলে তিনি অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও উচ্চপদস্থ আমলাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়ার কারণেই তিনি প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন।

যদিও দুদক শরীফ উদ্দিনের অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ থাকায় কমিশন তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করতে বাধ্য হয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের ভিন্নমুখী বক্তব্য জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।

দুদকের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "দুদকের ভেতরেই যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে তারা কীভাবে কাজ করবে? মানুষ তাদের ওপরই-বা আস্থা রাখবে কীভাবে? ভূত তো সর্ষের মধ্যেই।" তিনি আরও বলেন, জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে দুদককে নিজেদের অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি কার্যক্রম জোরদার করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

একইভাবে, দুদকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সমালোচনা করেছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য ও আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। জাতীয় সংসদে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি দুদকের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং কমিশনের অভ্যন্তরে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, দুর্নীতি দমনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও যদি দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তবে তা প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ও জনআস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এ ছাড়া দুদকের মামলায় হয়রানির অভিযোগ করা কয়েকজন সাবেক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, কিছু তদন্তকারী কর্মকর্তা নিরপরাধ ব্যক্তিদেরও হয়রানির শিকার করেন। তাদের অভিযোগ, তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে আইনি জটিলতা ও চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করার আশঙ্কা দেখিয়ে অনেকের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনায় কেউ কেউ আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েন। তবে ভয়, সামাজিক সংকোচ এবং মামলার জটিলতা আরও বাড়ার আশঙ্কায় অধিকাংশ ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে চান না। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই করতে হলে শুধু বাইরের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না; একই সঙ্গে তদন্তকারী সংস্থার অভ্যন্তরেও কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হবেন না এবং প্রকৃত অপরাধীরাই আইনের আওতায় আসবেন।

সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক দুর্নীতি দমন কমিশনের বিকল্প নেই। তাই দুদকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং সৎ কর্মকর্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরপরাধ নাগরিকদের অধিকারও সমানভাবে রক্ষা করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, দুদক নিজেদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা দূর করে আরও স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এতে যেমন দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে, তেমনি নিরপরাধ মানুষ হয়রানির অভিযোগও কমে আসবে এবং আইনের শাসন আরও সুদৃঢ় হবে।