রাজধানীতে শনিবার সকাল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি রোববার মধ্যরাতের পর অতি ভারী বর্ষণে রূপ নেয়। টানা দুই দিনের বৃষ্টিতে ঢাকায় ১৯২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এই বৃষ্টির ফলে রাজধানীর নীলক্ষেত, জিগাতলা, গেন্ডারিয়া, মতিঝিল, শান্তিনগর, কাকরাইল, কমলাপুর, শাহজাহানপুর, পুরান ঢাকা ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। কোথাও চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পেরিয়েও পানি নামেনি। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী এবং দিনমজুরসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের মতে, শুধু অতিবৃষ্টিই নয়, রাজধানীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার মূল কারণ হলো অকার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। খাল, ড্রেন, স্লুইসগেট, পাম্পস্টেশন এবং অন্যান্য ড্রেনেজ অবকাঠামোর বড় অংশ ঠিকভাবে কাজ করছে না। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলেও সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, যন্ত্রপাতির বিকলাবস্থা, বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা এবং জনবলের সংকটের কারণে প্রতিবছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর বৃষ্টির পানি নদীতে নিষ্কাশনের জন্য থাকা ৪১টি স্লুইসগেটের মধ্যে মাত্র ১৯টি সম্পূর্ণ কার্যকর। বাকি ২২টির মধ্যে ছয়টি পুরোপুরি অচল এবং ১৫টি আংশিক সচল হলেও কার্যকরভাবে পানি নিষ্কাশনে ভূমিকা রাখতে পারছে না। এছাড়া এসব স্লুইসগেট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলেরও ঘাটতি রয়েছে।
পাম্পস্টেশনগুলোর অবস্থাও আশাব্যঞ্জক নয়। রাজধানীর আটটি প্রধান পানি নিষ্কাশন আউটলেটের অন্যতম কমলাপুর-টিটিপাড়া পাম্পস্টেশনের তিনটি বড় পাম্পের মধ্যে একটি প্রায় দেড় বছর ধরে বিকল। অন্য দুটি পাম্পও পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে না। ফলে ভারী বৃষ্টির সময় বিপুল পরিমাণ পানি দ্রুত অপসারণ সম্ভব হয় না। ড্রেন পরিষ্কারের জন্য ব্যবহৃত দুই সিটি করপোরেশনের পাঁচটি সাকার মেশিনের একটি দীর্ঘদিন ধরে অচল রয়েছে। একই সঙ্গে রাজধানীর ২৬টি খালের বড় অংশ নাব্যতা ও পানি ধারণক্ষমতা হারিয়েছে।
দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৩০৬ দশমিক ৩৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ঢাকায় প্রায় আড়াই কোটি মানুষের বসবাস হলেও সমগ্র শহরের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন কার্যত নির্ভর করে মাত্র আটটি প্রধান আউটলেটের ওপর। মালিবাগ, শান্তিনগর, পল্টন ও মতিঝিল এলাকার পানি টিটিপাড়া পাম্পস্টেশনের মাধ্যমে নিষ্কাশিত হয়। পুরান ঢাকা, আজিমপুর, গুলিস্তান ও হাজারীবাগ এলাকার পানি ধোলাইখাল হয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রবাহিত হয়। গ্রিন রোড, পান্থপথ ও তল্লাবাগ এলাকার পানি হাতিরঝিল হয়ে রামপুরা পাম্পস্টেশনে পৌঁছে। অন্যদিকে শ্যামলী ও মোহাম্মদপুর এলাকার পানি কল্যাণপুর আউটলেট, এয়ারপোর্ট এলাকার পানি আব্দুল্লাহপুর আউটলেট, আশুলিয়ার পানি গোড়ান-চটবাড়ি এলাকা এবং যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, জুরাইন ও ডিএনডির কিছু অংশের পানি শিমরাইল পাম্পস্টেশনের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীতে নিষ্কাশিত হয়।
তবে নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীদের মতে, পাঁচ দশক আগে যে সংখ্যক আউটলেট ছিল, এখনও মূলত সেই অবকাঠামোর ওপরই নির্ভর করছে দ্রুত বর্ধনশীল মহানগর ঢাকা। জনসংখ্যা ও নগরায়ন বহুগুণ বাড়লেও পানি নিষ্কাশন অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ হয়নি। ফলে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হলে বিদ্যমান আউটলেটগুলো অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে ব্যর্থ হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বলছে, ১৯৫৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকার বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ২ হাজার ১৭ দশমিক ৭ মিলিমিটার। মোট বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কিছুটা কমলেও অল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় একদিনে সর্বোচ্চ ৩৪১ মিলিমিটার এবং টানা দুই দিনে ৪৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৫৩ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে ৪৭ বছরে মাত্র তিনবার একদিনে ২৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলেও ২০০১ থেকে ২০২৪ সালের মাত্র ২৪ বছরে একই মাত্রার বৃষ্টিপাত তিনবার ঘটেছে। ফলে পুরোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
প্রকৌশলীরা জানান, রাজধানীর অধিকাংশ ড্রেন কয়েক দশক আগে নির্মিত হয়েছিল। সে সময়ের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বিবেচনায় রেখে এসব ড্রেনের নকশা করা হয়। বর্তমানে স্বল্প সময়ে অধিক পরিমাণ বৃষ্টিপাত হওয়ায় সেগুলো সেই চাপ নিতে পারছে না। তাছাড়া অনেক এলাকার পানি সরাসরি নদীতে না গিয়ে একাধিক এলাকা ঘুরে দূরের আউটলেটে পৌঁছায়। এতে একাধিক এলাকার পানি একই পথে প্রবাহিত হওয়ায় জলাবদ্ধতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
এছাড়া ড্রেনে পলিথিন, প্লাস্টিক, রাবার, স্পঞ্জ ও অন্যান্য বর্জ্য জমে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নিয়মিত পরিষ্কার করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই ড্রেন আবার বর্জ্যে ভরে যাচ্ছে। ধোলাইখাল বক্স কালভার্টের প্রায় ৪০ শতাংশ অংশ বর্তমানে বর্জ্যে ভরাট হয়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন।
প্রতি বর্ষায় নীলক্ষেত থেকে জিগাতলা পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার পেছনে পুরোনো একটি অবকাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এরশাদ সরকারের সময়ে আজিমপুর ও নিউমার্কেট এলাকার পানি দ্রুত বুড়িগঙ্গা নদীতে পাঠানোর জন্য তিনটি বড় ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের পর নিরাপত্তাজনিত কারণে বিজিবি সদরদপ্তরের ভেতর দিয়ে যাওয়া দুটি ৩০ ইঞ্চি ড্রেন স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে একটি ড্রেন সচল থাকলেও সেটিও প্রায়ই প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্যে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে নীলক্ষেত, নিউমার্কেট ও জিগাতলা এলাকায় সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে।
২০২২ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছ থেকে স্লুইসগেটগুলোর দায়িত্ব গ্রহণের পর ডিএসসিসি দেখতে পায়, দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অধিকাংশ স্লুইসগেটের যান্ত্রিক অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। নদীতে জোয়ারের সময় ব্যাক-ফ্লো ঠেকাতে অনেক স্লুইসগেট বন্ধ রাখতে হয়। তখন পাম্পিংয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। কিন্তু পাম্পও পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ না করায় পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকে।
ডিএসসিসির বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ জানিয়েছেন, টিটিপাড়া পাম্পস্টেশনের বিকল পাম্পের পরিবর্তে নতুন পাম্প কেনার দরপত্র সম্পন্ন হয়েছে এবং শিগগিরই তা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে, ডিএসসিসির এক থেকে পাঁচ নম্বর অঞ্চলের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান খুঁজতে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম)-কে সমীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। সমীক্ষার সুপারিশ অনুযায়ী ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন, পানি নিষ্কাশনের পথ সংক্ষিপ্ত করা, অকার্যকর স্লুইসগেট মেরামত, পাম্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন সাকার মেশিন সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা মূলত একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। অতীতে শহরের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকায় সবুজ অঞ্চল ও জলাভূমি থাকায় বৃষ্টির পানি সহজে মাটির নিচে প্রবেশ করতে পারত। বর্তমানে সেই পরিমাণ ১০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। জলাধার ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল দখল এবং কংক্রিটে আচ্ছাদিত ভূমির কারণে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশিত হতে পারছে না।
তিনি আরও বলেন, কেবল পাম্পের ওপর নির্ভর করে ঢাকার মতো মেগাসিটির জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়। কার্যকর স্লুইসগেট বৃদ্ধি, খাল পুনরুদ্ধার, নতুন আউটলেট নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সিটি করপোরেশনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের সমাধান হবে না।
ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাজিব খাদেম বলেন, ড্রেনে জমে থাকা বর্জ্য, পুরোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা, দীর্ঘ পানি নিষ্কাশন পথ এবং বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বৃদ্ধি—সব মিলিয়েই রাজধানীর জলাবদ্ধতা বাড়ছে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, ড্রেন ও নালা পরিষ্কার রাখা, পাম্প সচল রাখা এবং প্রয়োজনীয় জনবল মাঠে মোতায়েনের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর জলাবদ্ধতা কেবল একটি প্রকৌশলগত সমস্যা নয়; এটি নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়েরও বড় চ্যালেঞ্জ। তাই অবকাঠামোর আধুনিকায়নের পাশাপাশি খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় এবং নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা ছাড়া রাজধানীর জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।