ঢাকা, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৩:০৬:৪৩ PM

বিআইডব্লিউটিএর প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
13-07-2026 01:50:19 PM
বিআইডব্লিউটিএর প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এ দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটকে ঘিরে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সংস্থাটির সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. সুলতান আহমেদ খান। তার বিরুদ্ধে রাজধানীর ভাটারা থানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন সংশ্লিষ্ট একটি হত্যা মামলার আসামি হওয়ার দাবি করা হলেও এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, হত্যা মামলায় আইনি জটিলতা এড়াতে এবং প্রভাব খাটানোর উদ্দেশ্যে প্রায় ৫ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করে বিভিন্ন মহলে তদবির চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে নিজেকে সৎ, দক্ষ এবং বিএনপি-ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে সহানুভূতি অর্জনের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিআইডব্লিউটিএ-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, গত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফের আত্মীয় পরিচয়ে সংস্থাটিতে শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করেন সুলতান আহমেদ খান। অভিযোগ রয়েছে, বদলি, নিয়োগ, টেন্ডার এবং ড্রেজিং প্রকল্পসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্তে তার প্রভাব ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। এমনকি তার অনুমোদন ছাড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো না বলেও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শ্রমিক লীগ নেতা সনজিব কুমার দাসকে ব্যবহার করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সৎ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হতো। এর ফলে অনেক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ও পেশাগতভাবে কোণঠাসা অবস্থায় ছিলেন বলে দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা।

গত বছরের ২ অক্টোবর মো. সুলতান আহমেদ খানকে বিআইডব্লিউটিএ থেকে অব্যাহতি দিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে পাঠানো হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সংস্থা থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তার অনুসারীরা বিভিন্নভাবে সংস্থার অভ্যন্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএতে শ্রমিক দলের সভাপতি মাজহারুল ইসলামের ওপর হামলার ঘটনায়ও সুলতান আহমেদ খানের অনুসারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় একটি মামলাও দায়ের হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও মামলার তদন্ত এখনো চলমান এবং এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি।

এদিকে পাবনা ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের ড্রেজিং প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, নদী খননের মাধ্যমে উত্তোলিত মাটি বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং প্রকল্প থেকে অর্জিত রাজস্ব রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব অভিযোগ বর্তমানে তদন্তাধীন।

আরও অভিযোগ রয়েছে, তিনি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হওয়া সত্ত্বেও ভুয়া শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করে পদোন্নতি নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদে উন্নীত হন। পাশাপাশি ১৯৯৬ সালে তার সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

বিআইডব্লিউটিএ-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মহলের সমর্থন থাকায় দীর্ঘদিন তিনি সংস্থায় অপ্রতিরোধ্য প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম হন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বিভিন্ন সময় নিজের রাজনৈতিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে সহকর্মীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করতেন। যদিও এ ধরনের বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।

এছাড়া পাবনা জেলার শতাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও দাবি করা হচ্ছে। বর্তমানে তিনি রাজধানীর উত্তরায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো আদালতের রায় বা চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।

বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা জানিয়েছেন, মো. সুলতান আহমেদ খানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের একটি তদন্ত দলও তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে। তদন্ত শেষ হলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এখনো বিভিন্ন দপ্তরে বেনামি অভিযোগপত্র পাঠিয়ে সৎ কর্মকর্তাদের হয়রানির চেষ্টা করা হচ্ছে। এর ফলে অনেক কর্মকর্তা সামাজিক, পারিবারিক ও পেশাগতভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন এবং কর্মপরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, বর্তমান অন্তর্র্বতী সরকারের নৌখাত সংস্কার কার্যক্রম ব্যাহত করতেই একটি স্বার্থান্বেষী চক্র সক্রিয় রয়েছে। সরকারের নৌপথের নাব্যতা রক্ষা, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নৌখাত বিশেষজ্ঞদের মতে, বিআইডব্লিউটিএতে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক প্রভাব, টেন্ডার সিন্ডিকেট এবং দুর্নীতির সংস্কৃতি দূর করতে হলে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক সংস্কার, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করা হলে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। তবে উত্থাপিত সব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থা এবং আদালতের সিদ্ধান্ত।