ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৬:০৩:২১ PM

নিয়ন্ত্রণহীন ওষুধের বাজারে বাড়ছে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
09-07-2026 03:44:49 PM
নিয়ন্ত্রণহীন ওষুধের বাজারে বাড়ছে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি

দেশে ওষুধ বিক্রির খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে ওঠেনি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। বর্তমানে নিবন্ধিত ফার্মেসির সংখ্যা দুই লাখ ২৬ হাজারের বেশি হলেও এর বাইরে কয়েক লাখ ওষুধের দোকান কোনো ধরনের নিবন্ধন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, চাহিদার তুলনায় ফার্মেসির সংখ্যা অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও প্রতি মাসে গড়ে আরও ২৩৭টি নতুন ফার্মেসিকে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের প্রায় ৯৩ শতাংশ ফার্মেসিতে ওষুধ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা মডেল কাঠামো না থাকায় ওষুধের গুণগত মান ও কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য পাঁচ থেকে ১০টি ওষুধের দোকান যথেষ্ট। সেই হিসেবে প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে সর্বোচ্চ এক লাখ ৯০ হাজার ফার্মেসি প্রয়োজন। অথচ বর্তমানে নিবন্ধিত ফার্মেসির সংখ্যাই দুই লাখ ২৬ হাজার ছাড়িয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রায় এক লাখ অনিবন্ধিত ওষুধের দোকান, যেগুলোর অধিকাংশই প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা অনুসরণ করছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনাহীনভাবে লাইসেন্স প্রদান এবং নিবন্ধনবিহীন ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় ওষুধের বাজারে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাব্বির হায়দারের মতে, দেশে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ফার্মেসি রয়েছে। তিনি বলেন, জনসংখ্যা ও এলাকার চাহিদা বিবেচনা না করে লাইসেন্স দেওয়ার কারণে প্রায় প্রতিটি এলাকায় মুদি দোকানের মতো ওষুধের দোকান গড়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতি উন্নত দেশ তো বটেই, প্রতিবেশী ভারতেও দেখা যায় না।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত মোট ৪ হাজার ২৯টি নতুন ফার্মেসিকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৭৯টি প্রতিষ্ঠান মডেল ফার্মেসি হিসেবে অনুমোদন পেয়েছে, যা মোট অনুমোদনের মাত্র ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। অথচ ডিজিডিএর নীতিমালা অনুযায়ী একটি মডেল ফার্মেসির জন্য ন্যূনতম ৩০০ বর্গফুট জায়গা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি), ইনসুলিন ও ভ্যাকসিন সংরক্ষণের জন্য সচল রেফ্রিজারেটর এবং প্রশিক্ষিত গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট থাকা বাধ্যতামূলক।

দেশের অধিকাংশ ফার্মেসিতে এসব শর্তের কোনোটি বা একাধিকই অনুপস্থিত। ফলে ওষুধ সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে উচ্চ তাপমাত্রার কারণে অনেক ওষুধের রাসায়নিক গঠন পরিবর্তিত হয়ে কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকা অনুযায়ী সাধারণ ওষুধ ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (বিশেষ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রায় এবং ৬০ শতাংশের কম আপেক্ষিক আর্দ্রতায় সংরক্ষণ করতে হয়। জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, ইনসুলিন ও বিভিন্ন ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোল্ড-চেইন বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ফার্মেসিতে এসব মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে না।

রাজধানীর শাহবাগ, আজিজ কো-অপারেটিভ মেডিসিন মার্কেট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিপরীতের বিভিন্ন ওষুধের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানেই কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। অনেক ব্যবসায়ী স্বীকার করেছেন যে, উচ্চ তাপমাত্রায় ওষুধের মান নষ্ট হতে পারে, তবে এ বিষয়ে তারা কখনো কার্যকর তদারকি বা নির্দেশনা পাননি। কেউ কেউ আবার বাজার কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন।

ওষুধ সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রিও উদ্বেগজনক মাত্রায় চলছে। ওষুধ ও কসমেটিকস আইন-২০২৩ অনুযায়ী নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া প্রেসক্রিপশনভিত্তিক ওষুধ বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে ক্যানসারের মতো জটিল রোগের ওষুধও প্রেসক্রিপশন ছাড়াই বিক্রি হচ্ছে। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের আশপাশের কিছু ফার্মেসিতে রোগীরা শুধু মোবাইলে ওষুধের নাম দেখিয়েই ক্যানসারের ওষুধ কিনতে পারছেন। এতে ভুল ওষুধ সেবন, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং চিকিৎসাজনিত জটিলতার ঝুঁকি বাড়ছে।

ডিজিডিএর পরিচালক ড. মো. আকতার হোসেন জানিয়েছেন, মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ কেনাবেচা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। যদিও আইনে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে, সামাজিক বাস্তবতার কারণে শতভাগ আইন প্রয়োগ করা যাচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে প্রতি দুই বছর পরপর ড্রাগ লাইসেন্স নবায়ন বাধ্যতামূলক হলেও অনেক ব্যবসায়ী এই নিয়ম মানছেন না। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সে ব্যবসা পরিচালনার একাধিক উদাহরণ পাওয়া গেছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বহু ফার্মেসি বছরের পর বছর কোনো নিবন্ধন ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছে। ডিজিডিএর হিসাবে, দেশে প্রায় এক লাখ অনিবন্ধিত ফার্মেসি রয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে একযোগে কঠোর অভিযান চালালে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আপাতত সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

ঔষধ প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, বড় পাইকারি ওষুধ ব্যবসায়ীদের ছত্রছায়ায় অনেক অবৈধ ফার্মেসি টিকে আছে। খুচরা বিক্রির লাইসেন্স নিয়ে অনেকেই পাইকারি ব্যবসা করছেন। এসব অনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাজারে নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগে অনীহা। নীতিমালা অনুযায়ী মডেল ফার্মেসিতে প্রশিক্ষিত গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগ বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ মালিক অতিরিক্ত বেতন দিতে না চাওয়ায় অদক্ষ কর্মচারীদের দিয়েই ওষুধ বিক্রির কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। এতে রোগীরা প্রয়োজনীয় ওষুধ-পরামর্শ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং ভুল ওষুধ ব্যবহারের ঝুঁকিও বাড়ছে।

ড. আকতার হোসেন স্বীকার করেছেন যে, জনবল সংকটের কারণে সব ফার্মেসিতে নিয়মিত তদারকি করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাব্বির হায়দারের মতে, ফার্মেসি মালিকদের অনীহা এবং ঔষধ প্রশাসনের দুর্বল তদারকি—উভয় কারণেই পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে অনিবন্ধিত ফার্মেসিগুলোকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে, প্রয়োজন ছাড়া নতুন লাইসেন্স প্রদান সীমিত করতে হবে এবং প্রতিটি ফার্মেসিতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি কঠোরভাবে বন্ধ, লাইসেন্স নবায়ন বাধ্যতামূলক বাস্তবায়ন এবং গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে জনগণ নিরাপদ, মানসম্মত ও কার্যকর ওষুধ পাওয়ার নিশ্চয়তা পাবে এবং দেশের ওষুধ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।