ঢাকা, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৯:২০:১৬ PM

একা... চেনা পৃথিবীর বিদায়!

আফসানা আরেফিন
05-07-2026 08:05:57 PM
একা... চেনা পৃথিবীর বিদায়!

​‘আব্বা’— কেবল যুক্ত অক্ষরের কোনো শব্দ নয়। এটি আমার অস্তিত্বের প্রথম সুর, আমার সমস্ত ঝড়ের পরে একমাত্র আশ্রয়স্থল এবং আমার জীবনের সবচেয়ে বড় হাহাকারের উপ্যাখান। এই একটি শব্দ উচ্চারণ করলেই বুকের ভেতর এক তীব্র আবেগিক বান ডেকে যায় যা আমার চেনা জগৎটাকে মুহূর্তে ভাসিয়ে নিয়ে যায় কোনো এক অতলান্ত অন্ধকারে। আজ আমার চারপাশ জুড়ে শুধু এক নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। যে অন্ধকারে আলোর কোনো দেখাই মিলছে না।

​সময়টা থমকে গিয়েছিল ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ মে, ঘড়ির কাঁটায় রাত ১১টা ৫২ মিনিটে। ​পরের দিন পবিত্র ঈদুল আজহা। আব্বার পছন্দের চালের রুটির অনলাইন অর্ডার কনফার্ম ঠিকই তারপরেও দিনভর কাজ সামলানোর আবেদনে আর্লি ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আর হোয়াটসঅ্যাপে শুভেচ্ছা বার্তা বিনিময়ের উদ্দেশ্যে টাচস্ক্রীনের কীবোর্ডে আঙুল। সাড়ে দশ টা থেকে এগারোটা অবদি আব্বা নফল নামাজ পড়লেন। এরপর নিত্যকার রুটিনে ঘুমোতে গেলেন। সাড়ে এগারোটার দিকে টের পেলাম আব্বা জেগে ওয়াশরুমে গেলেন। ঠিক একটু পরেই ঘরের নীরবতা ভেঙে ভেসে এলো আব্বার উচ্চ স্বরে দুটো কাশির শব্দ। সেই চিরচেনা কাশির আওয়াজ শুনেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন এক অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল। আমার বেডরুম ছেড়ে এক দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম আব্বার সামনে। আব্বা আমার দিকে তাকালেন। তাঁর সেই চাহনি, সেই কণ্ঠস্বর আজও আমার কানে অবিকল প্রতিধ্বনিত হয়। খুব স্পষ্ট স্বরে অথচ বুকের ওপর একটা হাত চেপে ধরে এক চিলতে মুচকি হাসি হাসলেন তিনি। সেই হাসিতে কোনো ক্লান্তি ছিল না, ছিল না কোনো ভয়ের চিহ্ন। যেন আমাকে অভয় দিতেই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ভাষায় বললেন— “দুই গ্লাস পানি খেয়ে আমি একটু অসুস্থ হয়ে পড়লাম।"  আমি প্রশ্ন করলাম গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেয়েছেন আব্বা? জবাব দিলেন হা দুটো গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেয়েছি। আরো একটা খাবো?” ​আমার ভেতর তখন এক মহাসমুদ্রের অশান্তি। তড়িঘড়ি করে এক পরম আকুলতায় বলে উঠলাম, “না না আব্বা, আর না!” গরম শ্যাক দিতে দিতে আরো কিছু সময় পার হতেই সিএনজি চলে আসলো।

​আহা... কত নিষ্ঠুর! কত নিরুপায় আমরা প্রকৃতির এই অমোঘ নিয়মের কাছে। ঘড়িতে তখন রাত ১২টা ১৫ মিনিট। কোনো কিছু ভাবার বা বোঝার সময় ছিল না। তড়িঘড়ি করে আমরা হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। গাড়িতে আমার কোলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে আছেন আব্বা। চোখে চোখে কথা বলছেন, মুখ হা করে নিশ্বাস ছাড়ছেন, ঠোঁট নেড়ে আমার সাথে দোয়া পড়ছেন। কিন্তু তাঁর শরীরটা কেমন যেন টলে পড়ছে। নিজে নিজে ডান কাত হয়ে শুয়ে নিলেন বাম দিক থেকে ফিরে। কিন্তু আমার মন তখনো এক অলীক আশায় বুক বেঁধে আছে। আমি নিজেকেই নিজে সান্ত্বনা দিচ্ছি এই তো হাসপাতালে পৌঁছালেই সব ঠিক হয়ে যাবে। আব্বাকে একটু অক্সিজেন দিলেই তো তিনি আবার আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠবেন। আবার হাসবেন, আমাকে নাম ধরে ডাকবেন।

​হাসপাতালে পৌঁছে সমস্ত শক্তি দিয়ে সমস্ত আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে ডাক্তারের সামনে গিয়ে মিনতি করলাম, “প্লিজ, আমার আব্বাকে একটু অক্সিজেন দিন! ওতেই উনি ঠিক হয়ে যাবেন।” কিন্তু নিয়তির লিখন ততক্ষণে তার চূড়ান্ত রায় দিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসক এগিয়ে এলেন। আব্বার হাতটা তুলে নিয়ে নার্ভ দেখলেন। তারপর এক মুহূর্তের স্তব্ধতা ভেঙে উচ্চারণ করলেন সেই নির্মম শব্দ— ‘ইনঅ্যাক্টিভ’।

​আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। পাশের ইসিজি মেশিনের দিকে তাকালাম। সেখানে কোনো তরঙ্গ নেই, কোনো চড়াই-উতরাই নেই কেবল এক নিস্প্রভ, সোজা, শীতল সবুজ রেখা। যে রেখাটি জানান দিচ্ছিল আমার পৃথিবী চিরতরে স্থির হয়ে গেছে। আমার সহজ সরল সাদা মনের কালো আব্বা কথা বলছে না। 

​তারপর শুরু হলো এক যান্ত্রিক, অবাস্তব অধ্যায়। অ্যাম্বুলেন্সের তীব্র সাইরেনের হুইসেল চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তুলল। যে পথ দিয়ে কতবার আব্বার সাথে গিয়েছি সেই পথেই ফিরছি কিন্তু এবার আব্বা এক নিথর দেহ। স্টেইনলেস স্টিলের সেই শীতল খাটিয়ায় করে আব্বাকে যখন বাড়ির উঠোনে এনে রাখা হলো তখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামার জানান দিলো কয়েকটি ফোঁটা। যেন প্রকৃতিরও বুক ফেটে কান্না আসছিল আমার এই পিতৃহীনতার দিনে। বৃষ্টির জল থেকে আড়াল করতে আব্বার সেই নিথর শরীরটাকে এনে রাখা হলো ড্রয়িং রুমের ফ্লোরে। একটা হোগলার ওপর চাদরে ঢাকা অবস্থায় আব্বাকে দেখে নেওয়ার তীব্র উৎকন্ঠায় আমার চোখ বারবার ঘোলা হয়ে আসছিলো লোনা জলে। আমি তাকিয়ে রইলাম। এই তো সেই মানুষ যিঁনি এই ঘরের আলো ছিলেন। আমাকে দৃষ্টির বাইরে রাখতে না চাওয়া সেই আব্বা। ​রাত ফুরিয়ে ভোরের আজান ধ্বনিত হলো বাতাসে। প্রতিদিন এই আজানের শব্দে আব্বার ওজু করার তাড়া থাকত নয়ত জায়নামাজ বিছিয়ে সিজদাহ্ েঅবনত থাকতো। কিন্তু আজ কোনো তাড়া নেই। সব তাড়াহুড়োর ওপারে চলে যাওয়া এক নিথর শান্ত শরীর পড়ে আছে ফ্লোরে। 

সকালের সূর্যটা উঠল ঠিকই কিন্তু আমার জীবনের সবটুকু আলো কেড়ে নিয়ে। একে একে চেনা-অচেনা সব মানুষ আসতে শুরু করল। সবার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত কৌতূহল আর শোকের ছায়া। সবাই আসছে সাদা চাদরটা সরিয়ে শেষবারের মতো আব্বার মুখ দর্শন করছে।

​বেলা ১২টা। বাড়ির এক কোণে আব্বাকে শেষ গোসল করানো হলো। চারপাশটা কর্পূর আর আতরের এক স্বর্গীয় সুঘ্রাণে ভরে উঠল। এরপর শুরু হলো সাদা কাপড়ের বন্ধনে আবদ্ধ করার প্রক্রিয়া। যে মানুষটা নিজের অনিচ্ছায় আমার পছন্দের রঙিন পোশাকে আমার সামনে ঘুরে বেড়াতেন তিনি আজ তিন টুকরো সাদা কাপড়ের কাফনে মোড়ানো। এরপর কয়েকজনের কাঁধে চড়ে আব্বার শেষ যাত্রা শুরু হলো মসজিদের পানে। ​মসজিদের মাঠে জানাজা হলো। ইমাম সাহেবের কণ্ঠে ক্ষমা প্রার্থনার আকুল আবেদন। সবাই হাত তুলে আব্বার জন্য দোয়া করছেন আমিও ঠোঁট মেলাচ্ছি আর কেবল শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি আকাশের দিকে। জানাজা শেষে খাটিয়াটা এগিয়ে চলল চিরস্থায়ী ঠিকানা সেই অন্ধকার কবরের পানে। দূর থেকে ​কবরের দিকে দৃষ্টি আমার কারন মেয়ে বলে কবরের কাছে যাওয়া এই মুহূর্তে বেমানান। মোবাইলে রিং বাজছে। ফোন রিসিভ করছি না বলে হোয়াটসঅ্যাপে টেক্সট এলো আপনার রুটি রেডি নিতে কাওকে পাঠিয়ে দিন। আব্বাকে দুপুরে না খাওয়ায়েই সযতেœ নামিয়ে দেওয়া হলো মাটির ঘরে যেখানে আর কোনো দিন রোদ্দুর পৌঁছাবে না। বাঁশের চালুনি বিছিয়ে দেওয়া হলো ওপরে। তারপর... মুঠো মুঠো মাটি। চারপাশের বাতাস তখন এক অসীম বেদনায় ভারী হয়ে উঠেছে। আমার চোখের জল আর মাটির গন্ধ মিশে একাকার হয়ে গেল। সবাই আব্বাকে রেখে চলে গেলেন। আমি কবরের পাশে গিয়ে আমার সমস্ত মুখে কবরের মাটি মাখালাম। আব্বার গন্ধ মাখা জামা কাপড় নাকে চেপে ধরলাম। আব্বা কই? আমার কালো আব্বা কই!!

​সব শেষ। এখন কেবল একটা স্থির চিত্র।
​আজ আমি সেই চেনা রাস্তাঘাট দিয়ে হেঁটে যাই। পথটা, দোকানপাট, গাছপালা সব আগের মতোই আছে। কোথাও কোনো পরিবর্তন নেই অথচ আমার চোখে সব কেমন যেন অচেনা লাগছে। চেনা মানুষগুলোর দিকে তাকালে আজ বড্ড অচেনা লাগছে। মনে হয় এই পৃথিবীতে আমার আর কেউ নেই আমি সম্পূর্ণ একা। পৃথিবী তার নিজের নিয়মে চলছে শুধু আমার টাইমলাইনে ২৮ মে ২০২৬ এর সেই রাত ১২টা ৩৫ মিনিটেই সময়টা চিরতরে থমকে গেছে।

​এরপর আর কোনো ভোর হয়নি। ​হোগলা আর চাদরে এক চেনা পৃথিবীর মৃত্যু হয়েছে। ​নিস্প্রভ ইসিজিতে এক অনাথ বসন্তের শুরু হয়েছে। ​বাঁশের চালুনির নিচে থমকে যাওয়া টাইমলাইনে সুঘ্রাণে মাখা একটি সাদা চিরকুটের ​কোনো প্রত্যাবর্তন নেই। ​কার্বন কপি পৃথিবী অথচ সবটাই কাচ ভেঙে চুরমার। চেনা শহরে একলা পরিযায়ী। আর কোনো লেখায় বলবো না বেঁচে থাকা সুন্দর, বলবো মৃত্যু কত দূরে?

আফসানা আরেফিন ,লেখক: কবি, লেখক, কলামিস্ট ও এমফিল গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।