ঢাকা, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১১:০৮:৫০ PM

পশ্চিমবঙ্গে রেশন–ভাতা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
01-07-2026 09:57:28 PM
পশ্চিমবঙ্গে রেশন–ভাতা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পরিচালিত ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) কার্যক্রমের ফলে প্রায় ৯০ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর পর নতুন বিজেপি সরকার ঘোষণা দিয়েছে, যাদের নাম ভোটার তালিকায় নেই, তারা সরকারি রেশনসহ কয়েকটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাবেন না। এই সিদ্ধান্তে বহু মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আইনজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী এবং বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা একে সাংবিধানিক অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন।

মুর্শিদাবাদের ৪০ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক অন্তু শেখও ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়াদের একজন। দিনমজুর হিসেবে কাজের কারণে তাকে বিভিন্ন রাজ্যে যেতে হয়। তিনি নাম পুনর্বহালের জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন। তবে শুনানি ও অতিরিক্ত নথিপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় কাজ ছেড়ে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তার আশঙ্কা, ভোটাধিকার হারানোর পাশাপাশি সরকারি রেশনও বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা তার জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, মৃত ব্যক্তি, একাধিক নামে নিবন্ধিত ভোটার এবং সন্দেহভাজন ভোটারদের শনাক্ত করতেই এসআইআর পরিচালিত হয়েছে। বিজেপি সরকারও দাবি করছে, সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের শনাক্ত করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার হার তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদের মতো জেলায় এই প্রবণতা স্পষ্ট বলে দাবি করা হচ্ছে।

গত ৪ জুন পশ্চিমবঙ্গের খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তর একটি নির্দেশনা জারি করে জানায়, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের রেশন কার্ড নিষ্ক্রিয় করা হবে। পরে সরকার জানায়, যেসব ব্যক্তি ট্রাইব্যুনালে আপিল করেছেন, তাদের আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রেশন ও অন্যান্য সুবিধা চালু থাকবে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৩ লাখ মানুষ ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দা সাকিনা বানুও নাম পুনর্বহালের আবেদন করেছিলেন। তার অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সব নথি জমা দেওয়ার পরও কোনো শুনানি ছাড়াই আবেদন খারিজ করা হয়েছে। তিন সন্তানের জননী সাকিনা জানান, তার পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস সীমিত। হৃদরোগে আক্রান্ত স্বামীর চিকিৎসা একসময় সরকারি সহায়তায় সম্ভব হয়েছিল। বর্তমানে তিনি সরকারি রেশন ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে গেলে পরিবারের জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।

ভোটার তালিকার সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সংযোগ আরও বিস্তৃত হয়েছে নারীদের আর্থিক সহায়তা প্রকল্পেও। পূর্ববর্তী তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের চালু করা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে বর্তমান সরকার ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ করেছে এবং মাসিক ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে ৩ হাজার রুপি নির্ধারণ করেছে। তবে নতুন শর্ত অনুযায়ী, ভোটার তালিকা থেকে যাদের নাম বাদ পড়েছে তারা এই সুবিধা পাবেন না। ফলে বহু নারী ভাতা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।

হুগলি জেলার দুই সরকারি স্কুলশিক্ষক ইমতিয়াজ আহমেদ ও মুন্সি সিদ্দিক আহমেদের নামও ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করলেও তাদের আবেদনও কোনো কারণ না দেখিয়ে খারিজ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। পরবর্তীতে তাদের রেশন কার্ডের নথি এবং পরিবারের বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে। ইমতিয়াজের আশঙ্কা, ধাপে ধাপে তাদের সব সরকারি সুবিধা কেড়ে নেওয়া হতে পারে।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ভোটার তালিকায় নাম থাকা এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার মধ্যে কোনো আইনি সম্পর্ক নেই। মানবাধিকারকর্মী সঞ্জয় হেগড়ের মতে, ভোটার তালিকার ভিত্তিতে রেশন বা অন্যান্য সুবিধা বন্ধ করা ভারতের সংবিধানের সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যেহেতু ১৮ বছরের নিচের নাগরিকরা ভোটার নন, তাহলে কি তারাও সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন?

এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ‘পশ্চিমবঙ্গ খেতমজুর সমিতি’ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, এই নীতির ফলে ৩৫ থেকে ৬০ লাখ মানুষের রেশন কার্ড বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যদিও ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি জরুরি ভিত্তিতে গ্রহণ না করে কলকাতা হাইকোর্টে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

কলকাতার আইনজীবী আসিফ রেজা, যিনি নাম পুনর্বহালের আবেদনকারীদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করছেন, বলেন যে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম অত্যন্ত ধীরগতির। প্রতিদিন হাতে গোনা কয়েকটি মামলার শুনানি হওয়ায় লাখো আবেদন নিষ্পত্তি করতে দীর্ঘ সময় লাগবে। এতে বিচারপ্রার্থীদের আস্থা কমে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজ এই ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াকে ‘অনির্ভরযোগ্য ও স্বৈরাচারী’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, যাদের অন্যায়ভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের আবার রেশন থেকেও বঞ্চিত করা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত কঠোর সিদ্ধান্ত। একইভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য সাগরিকা ঘোষ বলেছেন, একটি বিতর্কিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে মানুষের খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার কেড়ে নেওয়া মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

মুর্শিদাবাদের আব্দুল বারীর মতো অনেক আবেদনকারী প্রশ্ন তুলেছেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লেই কি একজন নাগরিক তার অধিকার হারান? তাদের দাবি, ভোটাধিকার নিয়ে বিরোধ থাকলেও খাদ্য, রেশন ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক সুবিধা কোনোভাবেই বন্ধ করা উচিত নয়।

পুরো ঘটনাটি পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের সীমা ছাড়িয়ে এখন নাগরিক অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সাংবিধানিক সমতার প্রশ্নে জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর লাখো মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।