পর্ব -২
রিফাত দৌড়াচ্ছিল।
কী ঘটেছে, সে জানে না। শুধু বুকের ভেতর একটা অজানা আতঙ্ক ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছিল। প্রতিবেশী রবিন ভাইয়ের কাঁপা কণ্ঠ বারবার কানে বাজছিল—
"তুই এখনই বাড়ি আয়..."
কেন?
মা কি অসুস্থ?
মুনা কি পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছে?
নাকি বড় কোনো দুর্ঘটনা?
নিজেকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছিল, "না, নিশ্চয়ই এমন কিছু নয়। আমি বেশি ভাবছি।"
কিন্তু অস্থিরতা কমছিল না।
রাস্তার প্রতিটি সেকেন্ড যেন ঘণ্টার মতো দীর্ঘ হয়ে উঠছিল। মানুষের ভিড় ঠেলে, রিকশার পাশ কাটিয়ে, হাঁপাতে হাঁপাতে সে ছুটছিল।
তার চোখে তখন একটাই ছবি—দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মা।
"ফিরে আসিস বাবা..."
কথাগুলো বুকের ভেতর প্রতিধ্বনির মতো বাজছিল।
গলির মুখে ঢুকতেই রিফাত থমকে গেল।
অস্বাভাবিক ভিড়।
যতদূর চোখ যায়, মানুষ।
কেউ ফিসফিস করছে, কেউ চোখ মুছছে, কেউ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
একটি পুলিশের গাড়ি।
আরেকটি অ্যাম্বুলেন্স।
লাল-নীল বাতির আলো নিস্তব্ধ দুপুরটাকে আরও ভারী করে তুলেছে।
রিফাতের বুকের ধুকপুকানি যেন কানে শোনা যাচ্ছিল।
সে ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতে লাগল।
কেউ একজন তার কাঁধ ধরে বলল,
— "যাস না বাবা..."
সে হাত ঝেড়ে ফেলল।
আরেকজন বলল,
— "নিজেকে সামলে রাখিস..."
রিফাত চিৎকার করে উঠল,
— "আমার মা কোথায়?"
কেউ উত্তর দিল না।
এই নীরবতাই যেন সবচেয়ে ভয়ঙ্কর উত্তর।
বাড়ির সামনে এসে সে দেখল, দরজাটা খোলা।
সেই দরজা, যেখান থেকে সকালে মা তাকে বিদায় দিয়েছিলেন।
আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন অপরিচিত কিছু মানুষ।
পরিচিত উঠোনটাও যেন আজ অচেনা।
পুলিশ সদস্যরা কাজ করছেন।
প্রতিবেশীরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে।
কেউ তার দিকে তাকাতে পারছে না।
রিফাতের মনে হলো, সবাই যেন তার কাছ থেকে কিছু লুকিয়ে রাখছে।
সে কাঁপা গলায় বলল,
— "আমার মা কোথায়?"
একজন পুলিশ কর্মকর্তা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলেন।
চোখে গভীর সহানুভূতি।
তিনি কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন।
এই সময় রবিন ভাই এগিয়ে এসে রিফাতকে জড়িয়ে ধরলেন।
কিন্তু রিফাত নিজেকে ছাড়িয়ে নিল।
— "কী হয়েছে? কেউ কিছু বলছে না কেন?"
তার কণ্ঠে তখন আর্তনাদ।
কেউ উত্তর দিল না।
উঠোনের একপাশে চারটি সাদা কাপড় ঢাকা নিথর দেহ।
রিফাত প্রথমে বুঝতেই পারল না।
তার চোখ যেন বিশ্বাস করতে অস্বীকার করছিল।
চারটি?
কেন চারটি?
তার পা কাঁপছিল।
ধীরে ধীরে সে এগিয়ে গেল।
চারপাশে এমন নীরবতা, যেন পৃথিবীর সব শব্দ হঠাৎ থেমে গেছে।
একজন নারী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।
আরেকজন মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে রইলেন।
রিফাত কাপড়গুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
না।
এটা হতে পারে না।
এটা নিশ্চয়ই অন্য কেউ।
তার পরিবার নয়।
হতে পারে না।
হতেই পারে না।
একজন পুলিশ সদস্য খুব ধীরে প্রথম কাপড়ের কোণ সরালেন।
রিফাতের চোখ স্থির হয়ে গেল।
যে মুখটি প্রতিদিন ভোরে তাকে ডাকত, সেই মুখ আজ নিস্তব্ধ।
মায়ের কপালে আর স্নেহভরা হাত নেই।
ঠোঁটে আর কোনো হাসি নেই।
রিফাত যেন নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেল।
"মা..."
শব্দটি খুব আস্তে বের হলো।
কেউ শুনল কি না, সে জানে না।
তারপর দ্বিতীয় কাপড়।
বড় বোন।
যে প্রতিদিন বকাঝকা করত, আবার নিজের ভাগের খাবারটাও ভাইয়ের জন্য তুলে রাখত।
তৃতীয় কাপড়।
মেজো বোন।
যে গতকালও বলেছিল, "ভাইয়া, অঙ্কটা শিখিয়ে দিবি।"
চতুর্থ কাপড়।
সবচেয়ে ছোট।
মুনা।
যে সকালে চকলেট চেয়েছিল।
রিফাতের মনে পড়ল—
"টাকা থাকলে দুইটা আনব।"
কথাটা এখনও কানে বাজছে।
কিন্তু চকলেট আর কোনোদিন দেওয়া হবে না।
হঠাৎ রিফাত হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
তার মনে হচ্ছিল, শরীরের সব শক্তি যেন মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে গেছে।
সে মায়ের হাত ছুঁতে গেল।
কিন্তু থেমে গেল।
এ যেন তার চেনা সেই উষ্ণ হাত নয়।
তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল সকালের প্রতিটি মুহূর্ত।
মায়ের হাসি।
ডালের কথা।
দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মুখ।
"নিজের খেয়াল রাখিস।"
সবকিছু এত অল্প সময়ে স্মৃতিতে পরিণত হয়ে গেল?
এত সহজে?
চারপাশ থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল।
কেউ বলছিল,
"এমন পরিবার ছিল..."
কেউ বলছিল,
"আল্লাহ, এত বড় পরীক্ষা!"
কেউ আবার শুধু মাথা নাড়ছিল।
কিন্তু রিফাত যেন কিছুই শুনতে পাচ্ছিল না।
তার পৃথিবী যেন এক অদ্ভুত নীরবতার ভেতর ডুবে গেছে।
সে শুধু চারটি মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
যাদের সঙ্গে গতকালও কথা হয়েছে।
যাদের সঙ্গে রাতের খাবার খেয়েছে।
আজ তারা নিথর।
তার মনে পড়ল বাবার জানাজার দিন।
তখন মা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন,
"তুই ভেঙে পড়িস না। এখন থেকে তোদের জন্য আমাকেই শক্ত থাকতে হবে।"
আজ?
আজ কে তাকে জড়িয়ে ধরবে?
কে বলবে, "আমি আছি"?
এই পৃথিবীতে কি সত্যিই আর কেউ রইল?
রবিন ভাই পাশে বসে কাঁদছিলেন।
ধীরে বললেন,
"রিফাত..."
কোনো উত্তর নেই।
"ভাই..."
তবুও না।
রিফাত শুধু তাকিয়ে আছে।
যেন তার চোখের জলও পথ হারিয়ে ফেলেছে।
অনেক সময় এমন হয়—শোক এত গভীর হয় যে মানুষ কাঁদতেও পারে না।
একজন বৃদ্ধ প্রতিবেশী এগিয়ে এসে তার মাথায় হাত রাখলেন।
"বাবা, নিজেকে সামলাও।"
রিফাত ধীরে মুখ তুলল।
চোখদুটো লাল।
কিন্তু তাতে অশ্রুর চেয়ে বেশি ছিল শূন্যতা।
সে চারদিকে তাকাল।
এই উঠোনেই তো গত ঈদে সবাই একসঙ্গে ছবি তুলেছিল।
এই বারান্দায় বসে মা সন্ধ্যায় চা খেতেন।
এই ঘরেই বোনেরা পড়াশোনা করত।
সবকিছু আছে।
শুধু মানুষগুলো নেই।
বাড়িটা আছে।
কিন্তু সংসারটা নেই।
দুপুরের রোদ ধীরে ধীরে পশ্চিমে হেলে পড়ছে।
পুলিশ তাদের আনুষ্ঠানিক কাজ শেষ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
প্রতিবেশীরা কেউ পানি এনে দিচ্ছে, কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু রিফাতের কাছে সময় যেন থেমে গেছে।
তার মনে হলো, সকালে সে যে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছিল, সেই বাড়িতে আর কখনও ফিরতে পারবে না।
কারণ সেই বাড়ি আর নেই।
ইট, কাঠ, টিন—এসব দিয়ে শুধু একটি ঘর হয়।
মানুষ দিয়ে তৈরি হয় একটি বাড়ি।
আর তার বাড়ির সব মানুষ আজ চলে গেছে।
ধীরে ধীরে সে মায়ের পাশে বসে পড়ল।
কাঁপা হাতে মায়ের ওড়নার প্রান্ত স্পর্শ করল।
তারপর খুব আস্তে, যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছে, বলল—
"মা..."
একটু থামল।
চারদিকে তাকাল।
তারপর এমন এক প্রশ্ন করল, যার উত্তর সেই উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা কারও কাছে ছিল না।
"আমার মা কী দোষ করেছিল?"
কেউ উত্তর দিল না।
হাওয়াও যেন থেমে গেল।
দূরে মসজিদ থেকে ভেসে এল আসরের আজান।
আর সেই সুরের মধ্যে রিফাতের ভাঙা কণ্ঠ হারিয়ে গেল।
তার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ রাত তখনও শুরুই হয়নি।
চলবে.........