ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
সময়: ১০:২১:৫২ PM

চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা গুরুত্ব পাচ্ছে

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
23-06-2026 09:03:53 PM
চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা গুরুত্ব পাচ্ছে

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো বিদেশ সফরে রয়েছেন। সোমবার (২৩ জুন) মালয়েশিয়ায় ১৮ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত সফর শেষে তিনি চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন। দালিয়ান থেকে বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে হাইস্পিড ট্রেনে বেইজিং যাবেন তিনি। সেখান থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে তার মূল চীন সফর। সফরকালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), অ্যাকশন প্ল্যান এবং প্রটোকল স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি তিস্তা মহাপরিকল্পনা দুই দেশের আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে।

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আল সিয়াম জানিয়েছেন, চীনের সঙ্গে মোট ১৫ থেকে ১৭টি দলিল স্বাক্ষরের বিষয়ে আশাবাদী বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি অ্যাকশন প্ল্যান এবং একটি প্রটোকল। তিনি বলেন, সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা দুই দেশের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে এবং সেখানে তিস্তা নদীসহ অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার বিষয়ও গুরুত্ব পাবে।

তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী। প্রায় ২৪০ বছরের পুরোনো এই নদীর সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের ২৫টি নদীর প্রবাহ যুক্ত রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে শুষ্ক মৌসুমে পানির স্বল্পতা এবং নদীভাঙনের কারণে তিস্তা অববাহিকার মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধাসহ পাঁচ জেলার লাখো মানুষ এ সমস্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।

এই প্রেক্ষাপটে চীনের সহায়তায় প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চীনের পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়নার (পাওয়ার চায়না) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর ভিত্তিতে প্রণীত প্রস্তাবনায় তিস্তার দুই তীরে পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির আদলে পরিকল্পিত স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনায় রয়েছে ১০৮ কিলোমিটার নদী খনন, ১৭৩ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ, চর খনন, নদীশাসন, আধুনিক কৃষি সেচব্যবস্থা, মৎস্য প্রকল্প, পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ এবং নদীর দুই তীরে আধুনিক নগরায়ণ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীর গভীরতা প্রায় ১০ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে সারা বছর পানি সংরক্ষণ এবং নৌ-চলাচল নিশ্চিত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি বন্যা ও নদীভাঙনের ক্ষয়ক্ষতি কমে আসবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ সুরক্ষা পাবে এবং প্রতিবছর অতিরিক্ত প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার কৃষি উৎপাদন সম্ভব হবে। এছাড়া ৭ থেকে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। প্রকল্পে নৌবন্দর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্যাম্প, থানা এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাবও রয়েছে।

চীন সফরে তিস্তা প্রকল্প ছাড়াও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, চীনা শিল্পকারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তর, অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালুর বিষয়গুলো আলোচনায় থাকবে। বাংলাদেশ চট্টগ্রাম-সাংহাই এবং চট্টগ্রাম-গুয়াংজু রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালুর বিষয়েও চীনের সহযোগিতা চাইবে।

এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ, আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য জোট আরসিইপিতে অংশগ্রহণ, ব্রিকস এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনে (এসসিও) বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার বিষয়ে চীনের সমর্থন চাওয়া হবে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রস্তাবিত বৈশ্বিক উন্নয়ন, বৈশ্বিক নিরাপত্তা, বৈশ্বিক সভ্যতা এবং বৈশ্বিক শাসন উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হবে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, সফরকালে নীলফামারীতে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। এ প্রকল্পে চীন অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন দিতে পারে বলে আশা করছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের জন্যও চীনের সঙ্গে একটি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এ সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি, যোগাযোগ ও নগরায়ণে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। ফলে দীর্ঘদিনের অবহেলিত তিস্তা অববাহিকা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।