ঢাকা, শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৩:০০:০৯ PM

উত্তরসূরি থেকে রাজপথের রাজা ইশরাক

মান্নান মারুফ
08-08-2026 01:18:42 PM
উত্তরসূরি থেকে রাজপথের রাজা ইশরাক

ঢাকার রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের যে কজন নেতা নিজেদের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন, ইশরাক হোসেন তাদের অন্যতম। সাবেক মেয়র, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য এবং বিএনপির প্রয়াত নেতা সাদেক হোসেন খোকার সন্তান হিসেবে রাজনীতিতে তাঁর পরিচয় তৈরি হলেও সময়ের সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক সক্রিয়তা, সাংগঠনিক ভূমিকা এবং রাজপথের উপস্থিতির মাধ্যমে তিনি স্বতন্ত্র একটি পরিচিতি গড়ে তুলেছেন।

ইশরাক হোসেনের জন্ম ১৯৮৭ সালের ৫ এপ্রিল। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকায়। তিনি ঢাকার স্কলাস্টিকা স্কুলে পড়াশোনা শেষে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। পড়াশোনা শেষে কিছু সময় যুক্তরাজ্যে পেশাগত জীবন কাটানোর পর তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় পরিচয়—তিনি সাদেক হোসেন খোকার ছেলে।

সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন অংশগ্রহণকারী এবং বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য, মন্ত্রী এবং অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে ইশরাকের রাজনীতিতে প্রবেশের পেছনে পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যেমন ছিল, তেমনি সময়ের সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করার চ্যালেঞ্জও ছিল।

রাজনীতির মাঠে ইশরাকের দৃশ্যমান উত্থান ঘটে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ২০২০ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। প্রাথমিক ফলাফলে তিনি ২ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। ওই নির্বাচনের ফল নিয়ে পরে তিনি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল ২০২০ সালের নির্বাচন বাতিল করে ইশরাক হোসেনকে বিজয়ী ঘোষণা করে এবং তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের নির্বাচিত হওয়ার গেজেট বাতিলের আদেশ দেয়।

রাজপথের রাজনীতিতেও ইশরাকের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, প্রতিবাদ ও দলীয় আন্দোলনে তাঁকে সক্রিয় দেখা গেছে। ২০২২ সালে মতিঝিল থেকে তাঁকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়। ২০২৩ সালেও তাঁর ওপর হামলার ঘটনা নিয়ে মামলা হয়েছিল। এসব ঘটনায় তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং মাঠপর্যায়ের উপস্থিতির বিষয়টি সামনে আসে।

ইশরাকের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। বিএনপির কর্মসূচিতে তাঁকে নিয়মিত মাঠে দেখা গেছে। তাঁর সমর্থকদের দাবি, দলের কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা এবং আন্দোলনের সময়ে তাদের পাশে থাকার কারণে ঢাকার বিএনপির রাজনীতিতে তাঁর একটি শক্তিশালী কর্মীভিত্তি তৈরি হয়েছে। তবে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার মূল্যায়ন স্বাভাবিকভাবেই মতভেদপূর্ণ; তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে সাহসী ও মাঠের নেতা হিসেবে দেখলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে।

বিএনপির রাজনীতিতে ইশরাকের অবস্থান বুঝতে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রকাশ্যে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শ, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং দলের  চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে দলীয় আদর্শের প্রতি এই অবস্থান বারবার প্রতিফলিত হয়েছে।

২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ইশরাক হোসেন। নির্বাচনে তিনি ৭৮ হাজার ৮৫০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মো. আবদুল মান্নান পান ৫৫ হাজার ৬৯৭ ভোট। ফলে ২৩ হাজার ১৫৩ ভোটের ব্যবধানে তিনি ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ইশরাক হোসেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটেও তাঁকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ রাজপথের সক্রিয় রাজনীতিক থেকে তিনি এখন জাতীয় সংসদ ও সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়েও অবস্থান করছেন।

তবে মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য হওয়ার পরও তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ঢাকার রাজনীতিতে আলোচনা থেমে নেই। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পরে তিনি জানান, দল মনোনয়ন দিলে তিনি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।

ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক পথচলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর সক্রিয় মাঠপর্যায়ের রাজনীতি। পারিবারিক পরিচয় তাঁকে রাজনীতির দরজা খুলে দিয়েছে—এ কথা বলা যায়; কিন্তু দীর্ঘদিন রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা, মামলা-গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়া এবং দলীয় কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছেন।

ঢাকার রাজনীতিতে একসময় সাদেক হোসেন খোকা, মির্জা আব্বাস কিংবা মোস্তফা মহসিন মন্টুর মতো নেতাদের নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হতো। সময়ের পরিবর্তনে সেই রাজনীতির প্রজন্মও বদলেছে। সেই পরিবর্তিত প্রজন্মের আলোচিত মুখগুলোর একজন ইশরাক হোসেন। তাঁর সামনে এখন চ্যালেঞ্জ আরও বড়—দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি সংসদীয় দায়িত্ব, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এবং ঢাকার নগর রাজনীতিতে নিজের অবস্থানকে আরও সুসংহত করা।

রাজনীতিতে উত্তরাধিকার গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে একজন নেতার অবস্থান নির্ধারিত হয় তাঁর কাজ, রাজনৈতিক কৌশল, জনসম্পৃক্ততা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতার মাধ্যমে। ইশরাক হোসেনের ক্ষেত্রেও আগামী দিনের রাজনীতি সেই পরীক্ষাই নেবে। ঢাকার রাজনীতির তরুণ প্রজন্মের এই নেতা শেষ পর্যন্ত কতটা প্রভাবশালী জাতীয় রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত হন, তা নির্ধারণ করবে তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই।