ঢাকা, শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০২:৫২:৪৮ AM

গণঅভ্যুত্থানের ‘জীবন্ত সাক্ষী’ জুলাই স্মৃতি জাদুঘর

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
06-08-2026 08:34:49 PM
গণঅভ্যুত্থানের ‘জীবন্ত সাক্ষী’ জুলাই স্মৃতি জাদুঘর

২০২৪ সালের জুলাই। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গত কয়েকবারের মতো ফের শুরু হয় আন্দোলন। উচ্চ আদালতের রায়ের জেরে আগের কোটাব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হলে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষার্থীরা পথে নামেন। তাদের মূলত দাবি ছিল- চাকরিতে বৈষম্য দূর করে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা। কিন্তু আন্দোলনে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ এবং দমন-নিপীড়নের কারণে তা একপর্যায়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ ও দেশ ছাড়তে হয়। রক্তাক্ত এই আন্দোলন, যা একসময় গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়, তাতে জনরোষের কেন্দ্রবিন্দু ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন ‘গণভবন’। ৫ আগস্ট সরকার পতনের দিন তা দখল করে নেয় বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা।সেই গণভবন এখন ইতিহাসের নতুন ঠিকানা হয়েছে। পরিচিতি পেয়েছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে। অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে বুধবার (৫ আগস্ট) আনুষ্ঠানিকভাবে এ জাদুঘরের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনের পরদিন বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) থেকে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এটি। এদিন সকাল থেকেই নগরী ও আশপাশের জেলার সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এ জাদুঘর।ফটক খোলার আগেই উপচেপড়া ভিড়
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকায় জুলাই জাদুঘরের সামনে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকে অপেক্ষমাণ দর্শনার্থীদের ভিড়। ভেতরে ঢুকতে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকশ মানুষ। বেলাল নামের এক দর্শনার্থী বলেন, ‘সকাল ৯টা থেকে দাঁড়িয়ে আছি। এসে দেখি গেট বন্ধ। কেউ খুলছে না। অনলাইন-অফলাইন দুভাবেই টিকিট কাটার চেষ্টা করলাম কিন্তু সম্ভব হলো না। পরে ভেতরে অবজেকশন দিলাম, এখন তারা চেষ্টা করছে। আমরা যারা টিকিট কাটতে পারি নাই তারা ভেতরে গিয়ে টিকিট কাটবো।’

পরে বেলা ১১টা নাগাদ ফটক খুলতেই দর্শনার্থীরা একে একে প্রবেশ করতে থাকেন জাদুঘরের ভেতরে। মেহেদী হাসান নামের একজন বলেন, ‘আমাদের জুলাইকে ঘিরে যে স্মৃতিগুলো রয়েছে, সেগুলো দেখার জন্য এসেছি।’আব্দুস সবুর নামের আরেকজন বলেন, ‘মনের অনুভূতি থেকেই ঘুরতে এসেছি। জুলাইয়ের দিনগুলোতে আমরাও মাঠে ছিলাম। অনেক পরিবারই আন্দোলনে ছিল। এখন ভেতরে যাবো। আন্দোলনের কী স্মৃতি দিয়ে সাজিয়েছে, সেগুলো দেখবো। জুলাইয়ের বাস্তব চিত্রগুলো দিয়েছে কি না, না কি মডিফাই করে কিছু দিয়েছে, সেগুলোই দেখতে এসেছি।’‘জুলাই একটা ইমোশনের জায়গা। এটা একটা হিস্টোরিক্যাল ও ম্যাজিক্যাল হাউজ। আমরা গাজীপুর থেকে অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দেখতে এসেছি। দেখবো এর ভেতরে কী আছে। এখান থেকেই তো পুরো দেশের কলকাঠিগুলো নাড়ানো হতো। সেগুলোই দেখতে এসেছি,’ যোগ করেন এই দর্শনার্থী।মাঠে নানা ভাস্কর্য আর খোদাই করে লেখা শহীদদের নাম
ভেতরে প্রবেশ করতেই সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে লাল রঙের একটি ভাঙা প্রাইভেটকার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। উপস্থিত দর্শনার্থীদের ধারণা, আন্দোলন-সংগ্রামের সময়ের সাক্ষী এই গাড়ি। এরপর সামনে এগিয়ে যেতেই সড়কের পাশে জুলাই আন্দোলনের ছবি ও লেখা সম্বলিত লম্বা বেশকিছু ফেস্টুন চোখে পড়ে।

একই সঙ্গে মাঠের মাঝখানে বৃহৎ জায়গাজুড়ে বৃত্তাকার আকৃতির প্রতীকী গণকবরের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর চারদিকে খোদাই করে লেখা রয়েছে শহীদদের নাম। এছাড়া মূল জাদুঘরের চারপাশজুড়ে থাকা সবুজ মাঠের বিভিন্ন স্থানে কিছু দূর পরপর নানা ভাস্কর্য বসানো হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানে আলোড়ন সৃষ্টি করা ঘটনা অবলম্বনে তৈরি করা হয়েছে এসব ভাস্কর্য।যার মধ্যে রয়েছে- জুলাইয়ে শহীদ মিনারের সামনে একজন রিকশাচালকের স্যালুট দেওয়ার দৃশ্য। আছে শহীদের মরদেহ কাঁধে নিয়ে রাজপথে মিছিলের ভাস্কর্য। সেই সঙ্গে স্কুলছাত্রীর সাইকেল চালিয়ে আন্দোলনে যোগ দেওয়া, রিকশার ওপরে গুলিবিদ্ধ মরদেহ, পুলিশের সাঁজোয়া যানে ঝুলে থাকা আন্দোলনকারীর মৃতদেহ, ইত্যাদি চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

পাশাপাশি আছে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় নিহত সেনা কর্মকর্তাদের ওপর ভাস্কর্য। সহকর্মীর কফিন কাঁধে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়া সেনা কর্মকর্তারাদের ছবি অবলম্বনে তৈরি করা হয়েছে এটি।প্রতিটি কক্ষই যেন ইতিহাসের জানালা
মূল জাদুঘরে প্রবেশ করে দেখা যায়- প্রতিটি কক্ষই যেন ইতিহাসের জানালা খুলে দিয়েছে। ‘১৬ বছরের ফ্যাসিবাদনামা’ শীর্ষক কক্ষে শেখ হাসিনার ১৫ বছর সাত মাসের একটি সংক্ষিপ্ত সফর ধরা তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে জুলাইয়ে ক্ষতবিক্ষত নানা আসবাবসহ বিভিন্ন জিনিস প্রদর্শিত হচ্ছে।

অন্য একটি কক্ষের নামকরণ করা হয়েছে ‘টর্চার রুম’। সেখানে পরিচিতি লেখা রয়েছে- এই কক্ষটি স্বৈরাচারী হাসিনার শাসনামলের অমানবিক অত্যাচার ও ক্ষমতার নৃশংসতার সাক্ষী। এখানে প্রদর্শিত যন্ত্র ও সরঞ্জামগুলো কেবল ধাতব বস্তু নয়, এগুলো বন্দীদের ওপর চালানো সীমাহীন নির্যাতনের প্রত্যক্ষ বিবরণ।যা আছে টর্চার রুমে
টর্চার চেয়ার- গুম করা ব্যক্তিদের টর্চার চেয়ারে বসিয়ে শরীরের ইলেক্ট্রিক শক দেওয়া হতো বলে সংশ্লিষ্ট বিবরণীতে জানানো হয়।

ড্রিল মেশিন ও চাবুক- র‍্যাবের গোয়েন্দা বিভাগ পরিচালিত একটি গোপন বন্দীশালার বিনষ্টকৃত আলামতের মধ্য থেকে এগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। মের শিকার ব্যক্তিদের নির্যাতনের জন্য এসব বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হতো।

মোটর গিয়ার-উইঞ্চ ব্যবস্থা- গিয়ার ব্যবস্থায় খুব ধীরে কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী বল প্রয়োগ করা হতো বন্দীদের। উইঞ্চের মাধ্যমে দড়ি বা তার টেনে কাউকে স্থির অবস্থায় জোরপূর্বক আটকে রাখা হতো।লোহার স্প্রিং এবং ব্যারেল- র‍্যাবের গোয়েন্দা বিভাগ পরিচালিত গোপন বন্দীশালার বিনষ্টকৃত আলামতের মধ্য থেকে এটি উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলো হলো বিভিন্ন অপারেশনে ব্যবহৃত অস্ত্রের ব্যারেল এবং অস্ত্রের ভেতরে থাকা স্প্রিং। অস্ত্রগুলো খণ্ড বিখণ্ড করে করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

স্টিলের চেন ও তালা- হ্যান্ডকাফে চেন লাগিয়ে ওপরের দিকে ঝুলিয়ে কোমড় ও পিঠে লাঠি দিয়ে মারা হতো বলে সংশ্লিট বিবরণীতে জানানো হয়।

সিমেন্টের ব্লক- গুম করা ব্যক্তিদের হত্যা করে মরদেহ ডোবানোর সময় এই ধরনের ব্লক ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

এছাড়া জাদুঘরটির নিচতলার অন্য কক্ষগুলোতে জুলাই আন্দোলনের নানা ছবি, শহীদদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, গুম হওয়া ব্যক্তিদের ব্যবহৃত জিনিসপত্রসহ বিভিন্ন চিত্রকর্ম দিয়ে সাজানো হয়েছে।
লাল টেলিফোন ও থ্রিডি প্রজেকশন
একটি কক্ষে রয়েছে বেশ কয়েকটি লাল টেলিফোন। এতে শেখ হাসিনার কলরেকর্ড শুনতে উপস্থিত দর্শনার্থীরা এসে কান পাতছেন। বড় একটি কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে সিনেমাহলের আদলে। যেখানে জুলাই আন্দোলনে আহত ও নিহতদের পরিবারের সাক্ষাৎকার দেখানো হচ্ছে। একটি বৃত্তাকার কক্ষের চারদিকের দেয়ালে প্রজেক্টরের মাধ্যমে আন্দোলনে সংঘর্ষের ভিডিওচিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। যেখানে উপস্থিত করা হয়েছে আন্দোলনের দিনগুলোর ভয়াবহতা।

কক্ষগুলোর বারান্দাজুড়েও রয়েছে নানা প্রদর্শনী। থ্রিডি প্রজেকশনের মাধ্যমে ৫ আগস্ট-পরবর্তী গণভবনের তৎকালীন অবস্থা ও বাস্তবচিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। যা দেখতে মানুষ আগ্রহ প্রকাশ করে ভিড় জমাচ্ছেন। ‘আয়নাঘর’ নামে কুখ্যাত যেসব গোপন বন্দীশালায় গুমের শিকার মানুষদের আটক রাখা হতো, সেই আয়নাঘরের আদলে প্রতীকী আয়নাঘরও উপস্থাপন করা হয়েছে সেখানে।শেখ হাসিনার বিছানায় শহীদের রক্তাক্ত শার্ট
জাদুঘরের দোতলাজুড়েও রয়েছে আন্দোলনের নানা স্মৃতি। সেখানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যবহৃত (ধারণা করা হয়) বিছানাটি শহীদের রক্তাক্ত শার্টসহ বিভিন্ন জিনিস দিয়ে সাজানো হয়েছে। এছাড়া দোতলার একটি কক্ষে নারীদের আন্দোলনের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে।

‘ইমার্সিক প্রজেক্ট' নামের একটি কক্ষের চার দেয়ালজুড়ে ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত ডিজিটাল পর্দা লাগানো হয়েছে। সেখানে ৩৬০ ডিগ্রি কোণ থেকে ১০টি প্রজেক্টরে প্রদর্শিত হচ্ছে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন দৃশ্য। এছাড়া পুরো ভবনটি সাজানো হয়েছে জুলাইয়ের নানা চিত্র ও স্মৃতি ধারণ করে। যা এখন আন্দোলনের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে।দিনগুলো কত ভয়াবহ ছিল তার উপলব্ধি তৈরি করবে
জাদুঘর দেখে ফিরছিলেন আমিনুল নামের এক দর্শনার্থী। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘অনেকদিনের ইচ্ছা ছিল ভেতরে কী আছে দেখার। সরকার পতনের পর কখনো সেই সুযোগ হয়নি। আজ এসেছিলাম দেখতে। সব ঘুরে ঘুরে দেখলাম, ভালো লাগলো। ভেতরে ঢুকলে আন্দোলনের দিনগুলো সম্পর্কে যে কেউ উপলব্ধি করতে পারবে যে দিনগুলো কতটা ভয়াবহ ছিল। সবকিছু দেখে ভালো লেগেছে।’

আরেক দর্শনার্থী মিনহাজ বলেন, ‘জুলাই জাদুঘর বাঙালির সারাজীবনের জন্য স্মৃতি হয়ে থাকবে। এই জাদুঘরে আন্দোলনের দিনগুলোর সবকিছু দিয়ে এমনভাবে সাজানো যে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম তা দেখলে জুলাই কতটা ভয়ানক ছিল সেটা সম্পর্কে জানতে পারবে। জাদুঘরের সবকিছু দেখে ভালো লেগেছে।’জাদুঘর সূত্রে জানা গেছে, এর সাপ্তাহিক ছুটির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে বৃহস্পতিবার। এতে দর্শনার্থীরা প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা, আবার দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৩টা এবং শেষে বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারবেন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ টাকা আর শিশুদের জন্য ২০ টাকা। জাদুঘরের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে টিকিট সংগ্রহ করা যাবে।