ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৮:০৭:৪৩ PM

প্রণোদনার নামে ৫ কোটি আত্মসাৎ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
10-09-2026 07:14:29 PM
প্রণোদনার নামে ৫ কোটি আত্মসাৎ

দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে অনিয়ম-দুর্নীতি থামেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। ‘উজ্জীবন আমানত ক্যাম্পেইন-২০২৬’-এর নামে গত জুনে প্রায় ৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৩ কর্মকর্তাকে ৪ কোটি টাকা প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হয়েছে। বাকি অর্থের বিষয়ে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।

ব্যাংকের প্রধান শাখায় পরিচালিত ওই কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএস) মো. হামিদুর রহমান এবং ট্রেজারি বিভাগের প্রধান মো. দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় এমডির সম্পৃক্ততার বিষয়টিও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বলে জানা গেছে।

ঘটনাটি তদন্ত করে ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও ব্যাংকিং খাতে এ ধরনের অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়। এসব ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি এখনো চলছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা না হলে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম বন্ধ হবে না।

৪ কোটি টাকা প্রণোদনা
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘উজ্জীবন আমানত ক্যাম্পেইন-২০২৬’-এর আওতায় কমার্স ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তাকে মোট ৪ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। ১৪টি চেকের মাধ্যমে এসব অর্থ উত্তোলন করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৪ জুন ৯টি চেকের মাধ্যমে ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা এবং ৭ জুন পাঁচটি চেকের মাধ্যমে আরও ৯৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। অর্থাৎ দুই দিনে মোট ৪ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কমার্স ব্যাংকের প্রধান শাখায় আনা ৫ কোটি টাকা তিনটি পাটের বস্তায় রাখা হয়। পরে সেগুলো ছয়টি বস্তায় প্যাকেট করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দুই কর্মকর্তা ওই টাকা নিয়ে শাখা ত্যাগ করেন।

পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ‘উজ্জীবন’ কর্মসূচির আওতায় ২৭০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা নতুন আমানত সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কর্মসূচির মেয়াদ ছিল ১৫ এপ্রিল থেকে ১৪ মে পর্যন্ত।

পরবর্তী সময়ে কর্মসূচির মেয়াদ ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হলেও বাড়তি সময়ের জন্য পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর ১৩ কর্মকর্তাকে ১০০ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহের বিপরীতে মোট ৪ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৪ টাকা হারে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।

প্রণোদনা পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন—এমডির পিএস মো. হামিদুর রহমান ৮০ লাখ টাকা, এফএভিপি মোহাম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক উল্লাহ ৮০ লাখ টাকা, এভিপি সালেহ আহমেদ ২০ লাখ টাকা, অফিসার মো. সরোয়ার ৮ লাখ টাকা এবং এফএভিপি সুজন দাস ৮ লাখ টাকা।

এ ছাড়া এভিপি তাশনুভা মজুমদার, মো. আহসান হাবীব ও পিও মো. আদনান শফিক প্রত্যেকে ৪০ লাখ টাকা করে পেয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন—মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, মো. মনিরুল হক, রিফাতুল মুরসালিন, সাইফুর রহমান ও শাহিনুর রহমান।

চেক নিয়ে কর্মকর্তাদের দাবি
কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তাদের স্বাক্ষর করা চেক মার্কেটিং বিভাগে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু টাকা উত্তোলনের সময় তারা শাখায় উপস্থিত ছিলেন না। তাদের দাবি, ‘বেয়ারার’ হিসেবে এসব টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

তবে প্রধান শাখায় সংরক্ষিত চেক পরীক্ষা করে বাংলাদেশ ব্যাংক দেখতে পেয়েছে, চেকগুলোর পেছনে কারও নাম বা স্বাক্ষর ছিল না।

এমডির বক্তব্য
এ বিষয়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়দুল হক বুধবার টেলিফোনে বলেন, বিষয়টি যেভাবে বলা হচ্ছে, তা সেভাবে নয়। পরিচালনা পর্ষদের মৌখিক অনুমতি নিয়েই কাজটি করা হয়েছে এবং পরে লিখিত অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, সামনাসামনি কথা বললে বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে।

সিসিটিভিতে দুই কর্মকর্তার টাকা নেওয়ার দৃশ্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৪ জুন বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আনা ৫ কোটি টাকা কমার্স ব্যাংকের প্রধান শাখার ভল্টে রাখা হয়। পরে টাকা ছয়টি পাটের বস্তায় প্যাকেট করা হয়।

সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা যায়, এমডির পিএস মো. হামিদুর রহমান এবং ট্রেজারি বিভাগের প্রধান মো. দেলোয়ার হোসেন ওই বস্তাগুলো খুলে টাকা গ্রহণ করেন। পরে তারা ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা নিয়ে কালো রঙের একটি গাড়িতে করে শাখা ত্যাগ করেন।

৭ জুন ওই দুই কর্মকর্তা আরও ৯৬ লাখ টাকা উত্তোলন করে শাখা থেকে বেরিয়ে যান। ফলে দুই দিনে তাদের মাধ্যমে মোট ৪ কোটি টাকা শাখা থেকে বেরিয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাংকের গাড়ির লগবুক, সিসিটিভি ফুটেজ ও চালকের বক্তব্য পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক দেখতে পেয়েছে, ৪ জুন দেলোয়ার হোসেন ও হামিদুর রহমান ওই গাড়িতে করে উত্তরা ক্লাবে এবং ৭ জুন গুলশান ক্লাবে যান।

লেনদেনের হিসাবেও অনিয়ম
পরিদর্শনে অর্থ উত্তোলন ও হিসাব সংরক্ষণে আরও অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪ জুন দুপুর দেড়টার দিকে ৪ কোটি টাকার নগদ লেনদেন করা হয়। ওই সময় অগ্রিম ব্যয় দেখিয়ে ১৩ কর্মকর্তার হিসাবে অর্থ দেওয়ার জন্য চেক ইস্যু করা হয়।

তবে ব্যাংকের লেজারে ওই লেনদেনের পোস্টিং করা হয় সন্ধ্যা ৭টায়। অর্থাৎ হিসাবের লেনদেন সম্পন্ন করার আগেই নগদ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগেও ব্যাংকের প্রধান শাখার সাসপেন্স হিসাব থেকে বিভিন্ন সময়ে ২৯টি এন্ট্রির মাধ্যমে ১১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এসব অর্থ ব্যবসা উন্নয়ন ও আমানত সংগ্রহের ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন বিভাগ বিষয়টি নিয়ে নিরীক্ষা করে।

দেলোয়ারের বিরুদ্ধে আগের অনিয়মের অভিযোগ
প্রতিবেদনে ট্রেজারি বিভাগের প্রধান মো. দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আগের বিভিন্ন অনিয়মের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, কমার্স ব্যাংকের প্রধান শাখায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি ব্যবসা উন্নয়নের নামে সাসপেন্স খাত থেকে বিভিন্ন সময়ে ১১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন।

এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ঢাকা-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে দেলোয়ার হোসেনসহ নয়জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে। ওই মামলার এজাহার অনুযায়ী, দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যাংকের ৭৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।

এজাহারে আরও বলা হয়, তিনি ৭ লাখ ৩ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের সোয়েটার যুক্তরাজ্যে রপ্তানির পর এর মূল্য দেশে ফেরত আনেননি। ২০২৩ সালের ১১ জুলাই মামলাটি করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এর আগে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের দায়ে দেলোয়ার হোসেন এনআরবিসি ব্যাংক থেকে চাকরি হারিয়েছিলেন। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী কোনো ব্যাংকে চাকরির অযোগ্য ব্যক্তি অন্য ব্যাংকে চাকরি করতে পারেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেই নিয়ম অমান্য করে তাকে কমার্স ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

বরখাস্তের সুপারিশ
এসব অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে মো. দেলোয়ার হোসেন ও মো. হামিদুর রহমানকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

একই সঙ্গে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে উঠে আসা এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয়, সেটিই দেখার বিষয়। অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।