ঢাকা, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৯:০১:১০ PM

অভিযোগের পাহাড়, তবু শীর্ষ পদে ওয়াহিদা

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
09-09-2026 08:12:05 PM
অভিযোগের পাহাড়, তবু শীর্ষ পদে ওয়াহিদা

ব্যাংকিং খাতে নারী কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘ কর্মজীবন পার করেছেন রাকাবের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং বর্তমানে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদা বেগম। তবে তাঁর কর্মজীবন ও বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন নিয়ে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে। নিয়োগের বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতের রুল, আদালত অবমাননার ঘটনায় দণ্ড, নিয়োগের সময় মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগ, ব্যাংকের বড় অঙ্কের লোকসান, পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুনর্বাসনের অভিযোগে তাঁর দায়িত্বকাল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ওয়াহিদা বেগম ১৯৯৮ সালে রূপালী ব্যাংক লিমিটেডে সিনিয়র অফিসার (প্রবেশনারি) হিসেবে ব্যাংকিং ক্যারিয়ার শুরু করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি রূপালী ব্যাংকের জোনাল ম্যানেজার, বিভাগীয় প্রধান এবং রূপালী সিকিউরিটিজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি ও আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সালের ১ মার্চ তিনি রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) প্রথম নারী এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেন।

তবে রাকাবের এমডি হিসেবে তাঁর নিয়োগ নিয়েই প্রথম বড় প্রশ্ন ওঠে। ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নিয়োগপত্রের মাধ্যমে তাঁকে রাকাবের এমডি করা হয়। পরে ওই নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করা হয়। রিটের পর আদালত বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগসংক্রান্ত নীতিমালা অনুসরণ না করে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কি না এবং নিয়োগটি আইনগতভাবে বিধিবহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না কেন—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।

এদিকে অগ্রণী ব্যাংকে দায়িত্ব পালনের সময় ওয়াহিদা বেগমসহ চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতের আদেশ অমান্যের অভিযোগে ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি তিন মাসের কারাদণ্ডের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে রাকাবের এমডি পদে নিয়োগের সময় তিনি ওই তথ্য গোপন করেছিলেন—এমন অভিযোগও ওঠে। তবে গণমাধ্যমে ওয়াহিদা বেগম দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট মামলাটি তাঁর ব্যক্তিগত বিষয় নয় এবং তিনি কোনো তথ্য গোপন করেননি।

রাকাবের আর্থিক পরিস্থিতিও তাঁর দায়িত্বকাল নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে ব্যাংকটির প্রায় ১৩২ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এই লোকসানের পেছনে ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং পরিচালনা পর্ষদকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। এমনকি এমডির কাছে ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে কৈফিয়ত চাওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি বিশেষায়িত ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় থেকে এত বড় লোকসানের কারণ কী—তা নির্ধারণে প্রয়োজন নথিভিত্তিক আর্থিক অডিট ও স্বাধীন তদন্ত।

ওয়াহিদা বেগমের বিরুদ্ধে পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, একটি পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪০ কর্মকর্তার কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছিল। এ অভিযোগের সমর্থনে চেকের কপি, মোবাইল আর্থিক লেনদেনের তথ্য ও অডিও থাকার দাবিও করা হয়েছে। তবে এসব নথির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও আর্থিক লেনদেনের ফরেনসিক পরীক্ষা প্রয়োজন।

এছাড়া করপোরেট গ্যারান্টি ছাড়া ঋণ অনুমোদন, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নিয়োগ ও পদোন্নতি এবং একটি প্রভাবশালী বলয়ের মাধ্যমে ব্যাংকের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার অভিযোগও এসেছে। পছন্দের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুবিধাজনক স্থানে পদায়ন এবং মতের অমিল থাকা কর্মকর্তাদের অন্যত্র বদলি করার মাধ্যমে প্রশাসনের ভেতরে একটি বিশেষ বলয় তৈরির অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট সময়ের বদলি ও পদায়নের আদেশ, বোর্ডের সভার কার্যবিবরণী এবং প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা করা জরুরি।

ওয়াহিদা বেগমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের অভিযোগও উঠেছে। প্রকাশিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, আগের সরকারের আমলে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত একটি অংশকে রাকাবে পুনরায় সংগঠিত করে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার মতো অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পরিচয়ের পরিবর্তে নিয়োগ, পদায়ন, বদলি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের নথিই তদন্তের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।

একজন শীর্ষ ব্যাংকারের বিরুদ্ধে নিয়োগসংক্রান্ত জটিলতা, আদালত-সংক্রান্ত বিষয়, পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্য, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যাংকের বড় অঙ্কের লোকসানের মতো একাধিক অভিযোগ উঠলে বিষয়টি আর ব্যক্তিগত বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকে না। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায় নির্ধারণে প্রয়োজন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়োগের আগে তাঁর যোগ্যতা ও মামলা-সংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, পদোন্নতি ও বদলিতে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না, ঋণ অনুমোদনে নিয়ম ভাঙা হয়েছিল কি না এবং ব্যাংকের লোকসানের প্রকৃত কারণ কী—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নিয়োগপত্র, ব্যক্তিগত ঘোষণাপত্র, আদালতের নথি, বোর্ডের কার্যবিবরণী, পদোন্নতি ও বদলির আদেশ এবং ঋণ অনুমোদনের ফাইল পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

অভিযোগগুলো সত্য হলে রাষ্ট্রীয় অর্থ এবং একটি বিশেষায়িত ব্যাংকের প্রশাসনিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দায় নির্ধারণ করতে হবে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেরও অবসান ঘটানো জরুরি। তাই রাকাব ও রাষ্ট্রীয় ব্যাংক খাতের স্বার্থে এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত বিতর্কের বাইরে গিয়ে নথিপত্রের ভিত্তিতে সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।

ওয়াহিদা বেগমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে একাধিকবার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ও অফিসের ল্যান্ডফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি।