ঢাকা, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৪:৪২:৩৭ PM

সাহাবুদ্দীন আহমদ: গণতন্ত্রের উত্তরণে এক নাম

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
06-09-2026 03:42:16 PM
সাহাবুদ্দীন আহমদ: গণতন্ত্রের উত্তরণে এক নাম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। তিনি দেশের ষষ্ঠ প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি ১৯৯০-৯১ সালে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের পর ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর, নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। সাহাবুদ্দীন আহমদ ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার পেমল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা তালুকদার রেসাত আহমদ ভূঁইয়া ছিলেন একজন সমাজসেবী ও জনহিতৈষী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫১ সালে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) এবং ১৯৫২ সালে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এমএ ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ১৯৫৪ সালে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে তৎকালীন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। লাহোর সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পাশাপাশি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকপ্রশাসন বিষয়ে বিশেষ কোর্স করেন। 


কর্মজীবনের শুরুতে তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। গোপালগঞ্জ ও নাটোরের মহকুমা প্রশাসক এবং ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে কাজ করার পর ১৯৬০ সালের জুনে তিনি বিচার বিভাগে বদলি হন। এরপর ঢাকা ও বরিশালে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার নিযুক্ত হন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে তাঁর নিয়োগ হয়। ১৯৭৩-৭৪ সালে তিনি শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক হন। 


বিচারপতি হিসেবে তাঁর বেশ কিছু রায় বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও আইনগত বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী মামলায় তাঁর পর্যবেক্ষণে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, জনগণের সার্বভৌমত্ব ও নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার সীমা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য উঠে আসে। তিনি বিচার বিভাগে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও অধস্তন আদালতের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও আপত্তি প্রকাশ করেন। এসব পর্যবেক্ষণ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সাংবিধানিক চিন্তাধারায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। 


১৯৮৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। কমিশন তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দিলেও তৎকালীন সরকার তা প্রকাশ করেনি। ১৯৮৪ সালে জাতীয় বেতন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বেতন কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়। 


১৯৯০ সালের ১৪ জানুয়ারি তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরই মধ্যে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের পদত্যাগের পর প্রধান রাজনৈতিক জোটগুলোর ঐকমত্যে সাহাবুদ্দীন আহমদ উপরাষ্ট্রপতি হন এবং সেদিনই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সেই সরকার ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে, যা সামরিক শাসনের অবসান ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করে। 


এই সময় তাঁর সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। বিশেষ ক্ষমতা আইনের কয়েকটি দমনমূলক বিধান সংশোধন বা বাতিল করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পরিসর বাড়ানো হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নথিতেও ১৯৯১ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনের সংবাদপত্র-স্বাধীনতাবিরোধী তিনটি ধারা বাতিলের কথা উল্লেখ রয়েছে। 


নির্বাচন শেষে ১৯৯১ সালের ১০ অক্টোবর সাহাবুদ্দীন আহমদ আবার প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যান। ১৯৯৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে অবসর নেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সরকারি তালিকাতেও তাঁর প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়কাল ১৪ জানুয়ারি ১৯৯০ থেকে ৩১ জানুয়ারি ১৯৯৫ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 


১৯৯৬ সালের ২৩ জুলাই তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ৯ অক্টোবর শপথ নেন। সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও তিনি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও নীতিনিষ্ঠতার পরিচয় দেন। ২০০০ সালে বহুল বিতর্কিত জননিরাপত্তা বিলের কিছু বিধান নিয়ে তিনি শুরুতে সম্মতি দিতে বিরত ছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পর তিনি বিলে সম্মতি দেন। ঘটনাটি রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর সাংবিধানিক বিবেচনাবোধ ও স্বাধীন অবস্থানের একটি আলোচিত দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। 

২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি জনজীবন থেকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে সরে যান। ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর পাঁচ সন্তান ছিল। স্ত্রী আনোয়ারা আহমদ ২০১৮ সালে মারা যান। তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. সিতারা পারভীন ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। 


দীর্ঘদিন নীরব জীবন কাটানোর পর ২০২২ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯২ বছর বয়সে সাহাবুদ্দীন আহমদ মারা যান। পরদিন ঢাকার বনানী কবরস্থানে স্ত্রীর কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। 

বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের জীবন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিচারকের আসনে সাংবিধানিক মূল্যবোধের পক্ষে অবস্থান, ১৯৯০ সালের রাজনৈতিক সংকটে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা এবং ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক ধারায় রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান তাঁকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন ও নিরপেক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা।

এই সংস্করণটি সংবাদ প্রতিবেদন/ফিচারধর্মী প্রকাশনার উপযোগী করে লেখা হয়েছে এবং যাচাইযোগ্য উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে বিতর্কিত বা অস্পষ্ট তথ্যগুলো সংশোধন করা হয়েছে।