ঢাকা, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ১০:৫৪:৩৭ AM

৭ হাজার কোটির যন্ত্র চলে ঘন্টা হিসাবে

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
04-09-2026 12:50:19 PM
৭ হাজার কোটির যন্ত্র চলে  ঘন্টা হিসাবে

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগ নির্ণয়ের আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে জেলা সদর, বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতাল—সব মিলিয়ে ৫১৩টি সরকারি হাসপাতালে প্রায় ৭ হাজার ৯২ কোটি টাকার চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয় যন্ত্রপাতি রয়েছে। কিন্তু জনবল সংকট, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ও যন্ত্রপাতি অচল থাকার কারণে এসবের সুফল পাচ্ছেন না অধিকাংশ রোগী।

সরকারি হাসপাতালের ল্যাব ও রোগ নির্ণয় কার্যক্রম সাধারণত সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চালু থাকে। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা রোগীরা এসব সেবা নেওয়ার সুযোগ পান। এরপরই অনেক হাসপাতালের ল্যাব, নমুনা সংগ্রহের কাউন্টার ও রোগ নির্ণয় কক্ষে তালা ঝুলে যায়। ফলে জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার। এর মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতায় ছয় শতাধিক হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীনে রয়েছে ৫১৩টি হাসপাতাল।

এসব হাসপাতালের মধ্যে ৪২৬টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম, ইউরিন অ্যানালাইজার, প্যাথলজি ল্যাব, অপারেশন থিয়েটার ও ব্লাড ব্যাংকের মতো সেবা রয়েছে। প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে গড়ে দুই কোটি টাকার যন্ত্রপাতি থাকলে ৪২৬টি হাসপাতালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮৫২ কোটি টাকা।

৬২টি জেলা সদর হাসপাতালে রয়েছে অন্তত ২০ কোটি টাকা করে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি। এ হিসাবে জেলা পর্যায়ে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৪০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। আটটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিটি স্ক্যান, এমআরআই, ভেন্টিলেটর, আইসিইউ, ডায়ালাইসিস, ইকো, ল্যাপারোস্কোপিসহ উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম রয়েছে। প্রতিটি হাসপাতালে গড়ে ২০০ কোটি টাকার হিসাবে এসব প্রতিষ্ঠানে যন্ত্রপাতির মূল্য প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

এ ছাড়া ক্যানসার, কিডনি, হৃদরোগ, অর্থোপেডিক ও বক্ষব্যাধিসহ বিভিন্ন রোগের ১৭টি বিশেষায়িত হাসপাতালে রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্রপাতি। সব মিলিয়ে ৫১৩টি হাসপাতালে যন্ত্রপাতির আনুমানিক মূল্য ৭ হাজার ৯২ কোটি টাকা।

তবে বিপুল অর্থ ব্যয়ে কেনা এসব যন্ত্রপাতির বড় অংশই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ব্যবহার হচ্ছে না। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ২২টি সরকারি হাসপাতালে নয় মাসের গবেষণায় দেখা গেছে, গত এক বছরে ৫২ শতাংশ রোগ নির্ণয় যন্ত্র একবারের জন্যও ব্যবহার হয়নি। নিয়মিত সেবা পাওয়া রোগীর হারও আগের ৬৫ শতাংশ থেকে কমে ২৫ শতাংশে নেমেছে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, ৪২৬টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে ১০১টিতে এক্স-রে পরীক্ষা বন্ধ। ১৯৬টিতে আল্ট্রাসনোগ্রাম হয় না। অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইসিজি সেবাও নিয়মিত নয়। এমনকি দুই-তৃতীয়াংশ উপজেলা হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষ অচল অবস্থায় রয়েছে।

এই সংকটের অন্যতম কারণ জনবল ঘাটতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স এবং পাঁচজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকা প্রয়োজন। সে হিসাবে দেশে প্রায় ৯০ হাজার মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে এ সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সরকারি হাসপাতালে টেকনোলজিস্টের অনুমোদিত পদ ৬ হাজার ৪০৬টি। এর মধ্যে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৩ হাজার ৮৯২ জন।

জনবল সংকটের কারণে বিশেষ করে ২৪ ঘণ্টার সেবা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি ব্লাড ব্যাংক বা জরুরি রোগ নির্ণয় কেন্দ্র সার্বক্ষণিক চালাতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক টেকনোলজিস্ট না থাকায় বিদ্যমান কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের পর সেবা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)-এর চিত্রও একই। রোগীরা সকালে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসক দেখাতে পারলেও দুপুরের পর অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পান না। ফলে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

পিপিআরসির গবেষণায় বলা হয়েছে, সরকারি হাসপাতালে রোগ নির্ণয় কার্যক্রম সীমিত থাকায় প্রায় ৭৫ শতাংশ রোগীকে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে যে পরীক্ষা প্রায় ২০০ টাকায় করা সম্ভব, একই পরীক্ষা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি খরচে করতে হচ্ছে।

এর ফলে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আর্থিক চাপ বাড়ছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ নাগরিককে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিবছর প্রায় ৬১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালের অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি কেনার পাশাপাশি সেগুলো পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো যন্ত্র নষ্ট হলে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে বছরের পর বছর সেটি পড়ে থাকার ঘটনাও রয়েছে। তাই ইলেকট্রো-মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ এবং দ্রুত মেরামত ব্যবস্থা চালুর ওপর জোর দিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুবের মতে, হাসপাতাল ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার ব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী স্বাভাবিক হলেও বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম কার্যত সীমিত সময়ের মধ্যে আটকে আছে। তার মতে, এ পরিস্থিতি বদলাতে হলে রাষ্ট্রকেই স্বাস্থ্য খাতের নীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে হবে।

সরকার অবশ্য সংকট সমাধানে দুই শিফটে হাসপাতালের সেবা চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, দুপুর বা বেলা আড়াইটার পর থেকে বিকেল বা সন্ধ্যা পর্যন্ত দ্বিতীয় শিফট চালুর বিষয়ে সরকার চিন্তাভাবনা করছে। এর জন্য চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামও বাড়াতে হবে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিতও জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, চিকিৎসক ও নার্সের পাশাপাশি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি হাসপাতালে থাকা হাজার হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি যদি নিয়মিত ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে রোগীদের বড় একটি অংশকে কম খরচে চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের সেবা দেওয়া সম্ভব। এজন্য শুধু নতুন যন্ত্র কেনা নয়, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, ২৪ ঘণ্টা সেবা চালু, দ্রুত যন্ত্র মেরামত এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।