ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০২:৩৫:৫৫ AM

রেজিস্ট্রেশনে মাইকেল-জান্নাতের ‘বদলি বাণিজ্য’

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
24-08-2026 08:09:06 PM
রেজিস্ট্রেশনে মাইকেল-জান্নাতের ‘বদলি বাণিজ্য’

রেজিস্ট্রেশন সেক্টরের সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি ও পদায়ন ঘিরে শত কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিআরএসএ) মহাসচিব ও খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, সংগঠনের পদকে প্রভাবের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তিনি একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বদলি, পদায়ন ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার নামে অর্থ আদায় করা হয়।

মাইকেল মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ঘনিষ্ঠজন ও ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেকের অবস্থান বদলালেও মাইকেলের প্রভাব কমেনি। বরং তিনি বর্তমানে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব ধরে রেখেছেন। বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে তার প্রভাব রয়েছে—এমন অভিযোগ করেছেন একাধিক সাব-রেজিস্ট্রার।

বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মাইকেল মহিউদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২৯তম বিসিএস নন-ক্যাডার থেকে সাব-রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাভার ও টঙ্গীসহ গুরুত্বপূর্ণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালনের সময়ও তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে বিআরএসএর মহাসচিব হওয়ার পর বদলি-পদায়ন ঘিরে তার প্রভাব আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বিপুলসংখ্যক সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়। এসব বদলির একটি অংশ অর্থের বিনিময়ে হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে বিআরএসএর কমিটির কয়েকজন সদস্য নিয়ম ভেঙে অল্প সময়ের ব্যবধানে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জাহাঙ্গীর আলম, গোলাম মোস্তফা, আব্দুল বাতেন ও মামুন বাবর মিরোজসহ কয়েকজনের পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, কমিটিতে পদ পাওয়ার পর এসব কর্মকর্তার কেউ কেউ দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ বা সুবিধাজনক কর্মস্থলে বদলি হয়েছেন। তবে এসব বদলির পেছনে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সম্পদের পাহাড়ের অভিযোগ

মাইকেল মহিউদ্দিন ও তার স্ত্রী জান্নাত নীলার নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ থাকার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় তাদের ও স্বজনদের নামে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি রয়েছে।

দুদকে দেওয়া একটি অভিযোগের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, আফতাবনগরে মাইকেলের নামে অন্তত ২৯টি ফ্ল্যাট রয়েছে। এ ছাড়া গুলশান, বসুন্ধরা, নিকেতন, বনশ্রী, মগবাজার, পান্থপথ ও পূর্বাচলসহ বিভিন্ন এলাকায় তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পত্তি রয়েছে।

অভিযোগে গুলশান-১-এর বিভিন্ন ভবনে একাধিক ফ্ল্যাট, বাণিজ্যিক স্পেস এবং নির্মাণাধীন সম্পত্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তার স্ত্রী জান্নাত নীলার নামেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্লট ও ফ্ল্যাট থাকার দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে প্রায় ১০০ বিঘা কৃষিজমি, মাছের ঘের ও ইটভাটার মালিকানার অভিযোগ রয়েছে। রূপগঞ্জের জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্প ও পূর্বাচলেও কয়েক বিঘা জমি থাকার দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।

তবে এসব সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য, বর্তমান বাজারমূল্য এবং অর্থের উৎস সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

দুদকে অভিযোগ

মাইকেল মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। গত ১৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাফসান আল আলভী এ বিষয়ে দুদকে অভিযোগ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগে শত কোটি টাকার বদলি বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের তদন্ত দাবি করা হয়েছে।

দুদক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, অভিযোগটি প্রাথমিকভাবে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল বা অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

প্রতিবেদককে হুমকির অভিযোগ

সম্প্রতি নবাবগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রার নাজমুলকে নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর মাইকেল মহিউদ্দিন ওই প্রতিবেদককে ফোন করে হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে মাইকেলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগকারীদের মতে, রেজিস্ট্রেশন খাতের বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা বা সংগঠনের নেতা ব্যক্তিগত প্রভাব ব্যবহার করে বদলি-পদায়নে হস্তক্ষেপ করেছেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।

মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রেজিস্ট্রেশন খাতে অতীতে জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি-পদায়নে অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

মাইকেল মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। একইভাবে তার স্ত্রী জান্নাত নীলা এবং অভিযোগে উল্লেখিত অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্যও তদন্তের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগগুলোর সত্যতা শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে। ইংরেজিতে তৈরী করে দাও