ঢাকা, শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৯:১৭:৫৮ PM

সংগ্রাম ও রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় রুহুল কবির রিজভী

মান্নান মারুফ
22-08-2026 03:04:27 PM
সংগ্রাম ও রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় রুহুল কবির রিজভী

নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর রুহুল কবির রিজভীর কথায় ছিল এক ধরনের আত্মসংশয়। এত বড় দায়িত্বের জন্য তিনি কতটা যোগ্য কিংবা দায়িত্বটি যথাযথভাবে পালন করতে পারবেন কি না—তা নিয়ে উদ্বেগের কথাই প্রকাশ করেছেন তিনি। বাইরে থেকে দেখলে এটিকে হয়তো নিজের অযোগ্যতার স্বীকারোক্তি মনে হতে পারে। তবে তাঁর প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক জীবন বিবেচনায় নিলে এই বক্তব্যের ভিন্ন একটি তাৎপর্যও পাওয়া যায়। সেটি হলো—নিজেকে বড় করে দেখানোর পরিবর্তে দায়িত্বকেই বড় করে দেখার মানসিকতা।

রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক পথচলা কোনো আকস্মিক পদপ্রাপ্তি কিংবা সুবিধাজনক সময়ের রাজনীতির গল্প নয়। এর শিকড় রয়েছে বাংলাদেশের স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে।

ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে যুক্ত হন রিজভী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক এবং পরে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। আশির দশকে এইচ এম এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দেশের ছাত্রসমাজ যখন রাজপথে আন্দোলন করছিল, তখন রিজভীও ছিলেন সেই আন্দোলনের সক্রিয় নেতৃত্বে। আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন তিনি। গুলি তাঁর মেরুদণ্ডে আঘাত করে এবং সেই আঘাতের কারণে তাঁকে স্থায়ী শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বহু বছর পরও সেই ক্ষত তাঁর শরীরে বয়ে বেড়াতে হয়েছে।

তবে শারীরিক এই আঘাত তাঁর রাজনৈতিক পথচলা থামাতে পারেনি।

১৯৮৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—রাকসু নির্বাচনে তিনি সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। ১৯৮৯-৯০ মেয়াদে তিনিই ছিলেন রাকসুর সর্বশেষ নির্বাচিত ভিপি। তখনও এরশাদবিরোধী আন্দোলন ছিল তুঙ্গে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় পর্যায়ের আন্দোলনের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার সময়টি তাঁর জন্য ছিল নেতৃত্ব, সংগ্রাম ও ব্যক্তিগত ত্যাগের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

এরপর ছাত্ররাজনীতিতে তাঁর নেতৃত্ব আরও বিস্তৃত হয়। ১৯৯২ সালের ১৬ জুন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে ভোটের মাধ্যমে তিনি সংগঠনটির সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করে ধীরে ধীরে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন তিনি।

তবে বিএনপি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি শুরু হয়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপির নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয় যখন নিয়মিত রাজনৈতিক উত্তেজনা, পুলিশি অভিযান, মামলা ও গ্রেপ্তারের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তখন রিজভী দীর্ঘ সময় ওই কার্যালয়েই অবস্থান করেন। দলীয় কর্মসূচি ঘোষণা, সংবাদ সম্মেলন, বিবৃতি এবং রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি হয়ে ওঠেন বিএনপির অন্যতম দৃশ্যমান মুখ।

দলীয় নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে ১৮০টির বেশি মামলা হয়। ২০১৩ সালের ৩০ নভেম্বর ভোরে বিএনপির নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে নির্মম ভাবে নির্যা তন করে টেনেহেচড়ে নিয়ে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার, কারাবাস ও রিমান্ডের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরোধের সেই সময়ে মামলা ও গ্রেপ্তার তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হয়।

সংসদ সদস্য কিংবা সরকারের কোনো ক্ষমতাবান পদে না থেকেও তিনি বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতির সামনের সারিতে ছিলেন। সংকটের সময়ে দলীয় কার্যালয় সচল রাখা, নিয়মিত সংবাদমাধ্যমের সামনে দলের অবস্থান তুলে ধরা এবং কর্মসূচি ঘোষণা করার কারণে তিনি ধীরে ধীরে বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখপাত্রে পরিণত হন।

২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। প্রায় এক দশক এই দায়িত্ব পালন করার পর ২০২৬ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পান। এরপর ১৫ আগস্ট তাঁকে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়।

এর মাত্র পাঁচ দিন পর, ২০ আগস্ট ২০২৬, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর রুহুল কবির রিজভীকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করা হয়। দলের গঠনতন্ত্রের ৭(খ)৬ ধারা অনুযায়ী তাঁর এই মনোনয়ন তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়।

ফলে নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর রিজভীর আত্মসংশয়ের বক্তব্যকে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার আলোকে দেখার সুযোগ রয়েছে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়া থেকে রাকসুর ভিপি হওয়া, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দেওয়া, দীর্ঘ বিরোধী রাজনৈতিক সময়ে মামলা-গ্রেপ্তার ও কারাবাসের মুখোমুখি হওয়া এবং দলীয় কার্যালয়ে থেকে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরা—প্রতিটি অধ্যায়ই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও রাজনৈতিক সহযাত্রী হিসেবে বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত মনে করেন, রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি কঠিন পরীক্ষাই তাঁর দৃঢ়তা, ত্যাগ ও দায়িত্ববোধকে আরও স্পষ্ট করেছে। তাঁর মতে, ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় রিজভী নিজেকে একজন নিবেদিত ও দৃঢ় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

গুলি থেকে কারাগার, রাকসুর ভিপি থেকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয় থেকে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম—একটির পর একটি অধ্যায় পেরিয়েই আজকের রুহুল কবির রিজভী।

তাই তাঁর নিজের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে—তিনি এই দায়িত্বের কতটা যোগ্য। তবে সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু তাঁর বক্তব্যে নয়; খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, সংগ্রাম, ত্যাগ এবং দায়িত্ব পালনের ইতিহাসের মধ্যেই।