ঢাকা, সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০১:৩৮:০৬ AM

দীর্ঘ সংগ্রামে রাজপথের পাঁচ পরীক্ষিত নেতা

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
16-08-2026 05:01:17 PM
দীর্ঘ সংগ্রামে রাজপথের পাঁচ পরীক্ষিত নেতা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু নেতা রয়েছেন, যাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ সংগ্রাম, মামলা, কারাবরণ, নির্যাতন এবং রাজপথের আন্দোলন। ক্ষমতার সুবিধা কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থের হিসাবের বাইরে থেকে যারা দীর্ঘদিন দলীয় আদর্শ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় থেকেছেন, তাদের মধ্যে মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, শামসুজ্জামান দুদু, জয়নুল আবদিন ফারুক এবং সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের নাম উল্লেখযোগ্য। বিএনপির রাজনীতিতে তারা দীর্ঘ সময় ধরে সামনের সারির নেতৃত্বে রয়েছেন।

যৌবনের বড় একটি সময় তারা কাটিয়েছেন রাজনীতির কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। কখনো আন্দোলনের রাজপথে, কখনো কারাগারে, আবার কখনো মামলা ও পুলিশি হয়রানির মুখোমুখি হয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই রয়েছে অসংখ্য মামলা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার অভিজ্ঞতা। এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তারা দলীয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াননি। বরং বিভিন্ন সময়ে দলের কর্মসূচি ও গণতন্ত্রের আন্দোলনে সক্রিয় থেকেছেন।

এই নেতাদের রাজনৈতিক পথচলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তারা নিজেদের রাজনীতিকে শুধু ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করেননি। দলের আদর্শ, সংগঠনের প্রতি আনুগত্য এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে তারা রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে তারা কতটা ব্যক্তিগত স্বস্তি পেয়েছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়েছেন মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ ও নানা ধরনের চাপ—এমনটাই তাদের রাজনৈতিক জীবনের বর্ণনায় উঠে আসে।

সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের রাজনৈতিক জীবন এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আলোচিত। তাকে বিএনপির রাজপথের মেধাবী ও পরীক্ষিত নেতৃত্বের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করেছেন এবং বিভিন্ন মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। তার রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি হিসাবে ৩৫৭টি মামলা, ২৯ বার রিমান্ড এবং প্রায় ২ হাজার ১৬০ দিন কারাবরণের কথা উল্লেখ করা হয়।  ।

শুধু আলাল নন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, রুহুল কবিররিজভী, শামসুজ্জামান দুদু এবং জয়নুল আবদিন ফারুকও দীর্ঘদিন ধরে মামলা ও রাজনৈতিক হয়রানির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে রাজনীতি করেছেন। তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই রয়েছে আন্দোলন, গ্রেপ্তার, মামলা এবং কারাবরণের নানা অধ্যায়। ফলে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে ‘রাজপথের সংগ্রামী নেতৃত্ব’ কথাটি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্ত হয়ে আছে।

গণতন্ত্রের আন্দোলনে একটি পর্যায় অতিক্রম করলেও এর স্থায়ী ভিত্তি নিশ্চিত করতে এখনো রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিএনপির এসব প্রবীণ নেতা মনে করেন, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে রাজনৈতিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। সে কারণে বয়স ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ভার থাকা সত্ত্বেও তারা এখনো মাঠের রাজনীতি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেননি।

রাজনীতিতে দীর্ঘ সংগ্রামের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—প্রাপ্তি কতটা, আর ত্যাগ কতটা? তবে এই নেতাদের রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে ব্যক্তিগত প্রাপ্তির চেয়ে দলীয় আদর্শ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়। ক্ষমতার ভাগ কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধার প্রত্যাশার পরিবর্তে তারা দলের সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্বের নির্দেশনা অনুযায়ী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন—এমন দাবি তাদের অনুসারীদের।

তাদের রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি দিক হলো প্রতিকূলতার মধ্যেও কর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টা। মামলা, কারাবরণ কিংবা রাজনৈতিক চাপের সময়েও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং তাদের মনোবল ধরে রাখাকে তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। দীর্ঘ সংগ্রামের কারণে ক্লান্তি থাকলেও রাজনৈতিক মাঠ থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার কোনো ইঙ্গিত তাদের কর্মকাণ্ডে দেখা যায় নি।

তবে এই লড়াইয়ের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত ক্লান্তি ও দীর্ঘদিনের কষ্টও জড়িয়ে আছে। বছরের পর বছর মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে চলার পর তারাও স্বাভাবিক জীবনের কিছুটা স্বস্তি চান। মুক্ত বাতাসে কিছুটা সময় কাটানো, পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে সময় দেওয়া কিংবা রাজনৈতিক চাপমুক্ত একটি দিন—এসব প্রত্যাশা যে কোনো দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মীর জন্যই স্বাভাবিক।

তবুও মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, শামসুজ্জামান দুদু, জয়নুল আবদিন ফারুক ও সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের রাজনৈতিক পথচলায় এখনো অবসরের চিহ্ন স্পষ্ট নয়। তাদের কাছে গণতন্ত্রের সংগ্রাম কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; বরং দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশ্বাস ও দায়বদ্ধতা। ব্যক্তিগত পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব একপাশে রেখে তারা এখনো দল, আদর্শ ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছেন।

রাজনীতির শেষ বিচারে ইতিহাসই মূল্যায়ন করবে কে কতটা ত্যাগ করেছেন, কে কতটা অবিচল ছিলেন এবং গণতন্ত্রের সংগ্রামে কার ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে এটুকু স্পষ্ট—দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়েও রাজপথে সক্রিয় থাকা এই নেতারা বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের সঙ্গে নিজেদের নাম যুক্ত করে রেখেছেন। তাদের প্রত্যাশা, একদিন গণতন্ত্র পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে; আর সেই দিনই দীর্ঘ সংগ্রামের ক্লান্তি কিছুটা হলেও প্রশমিত হবে।