ঢাকা, সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০১:৩৭:৩২ AM

ঘুষের টাকায় শফির ৬ কোটি টাকার সম্পদ!

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
16-08-2026 07:42:20 PM
ঘুষের টাকায় শফির ৬ কোটি টাকার সম্পদ!

সাতক্ষীরা সদর ভূমি অফিসের পিয়ন শফিউর রহমান শফির বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, জাল দলিলের মাধ্যমে নামজারি করানো এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রভাবিত করে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, টাকা দিলেই জটিল কাজ সহজ করে দেওয়ার একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটে ধুলিহরের কালাম ও দেবহাটার করিম মুহুরীর সম্পৃক্ততার কথাও উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে দুই লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে দুটি জাল দলিলের বিপরীতে নামজারি অনুমোদন করানোর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘুষের অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে এবং বাকি অংশ শফি ও তার সহযোগীরা নেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও আইনগত যাচাই প্রয়োজন।

নায়েবকে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (নায়েব) শর্মিষ্ঠা সরকারের ব্যক্তিগত ও গোপনীয় তথ্য জেনে তাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন শফি। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন অনিয়মের ক্ষেত্রে নায়েবের নাম ব্যবহার করে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হতো। সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ফুটেজে সদর ভূমি অফিসের সিঁড়ির নিচে বসে শফিকে টাকা গুনতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। শফি অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

জাল দলিলে নামজারির অভিযোগ

জাল দলিলের মাধ্যমে নামজারি করানোর অভিযোগের বিষয়ে সাতক্ষীরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে খোঁজ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট দলিলের তথ্য বালাম বইয়ের সঙ্গে মিল না পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। এমনকি কয়েকটি সংশ্লিষ্ট দলিল নম্বরের বালাম বইয়ের পৃষ্ঠা ছেঁড়া অবস্থায় পাওয়া গেছে বলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। বিষয়টি সত্য হলে তা গুরুতর অনিয়মের ইঙ্গিত দেয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিপত্র পরীক্ষা করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা প্রয়োজন।

বেতন ১৬ হাজার, সম্পদ কয়েক কোটি টাকার দাবি

শফির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ তার কথিত বিপুল সম্পদ নিয়ে। অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের দাবি, ১৬-১৭ হাজার টাকা বেতন স্কেলের একজন সরকারি পিয়নের দৃশ্যমান স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা। সাতক্ষীরা শহরের পারকুকরালী এলাকায় তার তিনটি এসিসংবলিত দোতলা বাড়ি, সাতক্ষীরা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে কয়েক একর কৃষিজমি এবং খুলনায় শ্বশুরবাড়ির এলাকায় কোটি টাকা মূল্যের প্লট রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকার একটি নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা ছেলের জন্য ফ্ল্যাট ভাড়া ও অন্যান্য খাতে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করার কথাও জানা গেছে। সম্প্রতি দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার সময় সাত লাখ টাকা দেনমোহর পরিশোধের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।

সেবাগ্রহীতাদের ক্ষোভ

স্থানীয় সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, সরাসরি আবেদন করলে কিংবা দাবি অনুযায়ী অর্থ না দিলে নামজারি ও অন্যান্য ভূমিসেবা সংক্রান্ত ফাইল আটকে রাখা হয়। কখনো সার্ভার থেকে আবেদন বাতিল করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ভুক্তভোগী আমীন রহমান ও আবুল হোসেনের অভিযোগ, নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকারের নাম ব্যবহার করে শফি ফাইলপ্রতি হাজার হাজার টাকা আদায় করতেন।

তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য এবং সরকারি নথি যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জরুরি।

শফির দাবি, অভিযোগ মিথ্যা

নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে শফিউর রহমান শফি দাবি করেছেন, তার সম্পদ বৈধ আয়ের মাধ্যমে অর্জিত। কাজের সিংহভাগ অর্থ নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকার নিজেই নিতেন বলেও তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে নিজের প্রভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন।

অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে শফির সম্পদের উৎস, ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, জমি ও ফ্ল্যাটের মালিকানা, নামজারি সংক্রান্ত সরকারি নথি এবং সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগে উল্লিখিত কর্মকর্তা ও দালালদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা দরকার।

স্থানীয় সচেতন মহল ও সেবাগ্রহীতারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।