ভয়াবহ বন্যায় দুর্গত মানুষের জন্য বরাদ্দ ত্রাণের বিস্কুট আত্মসাৎ এবং ফায়ার সার্ভিসের বিশেষায়িত জাহাজের জন্য বরাদ্দকৃত বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল অনিয়মের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও কোনো দৃশ্যমান বিভাগীয় তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়াই মো. মিজানুর রহমানকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ ‘উপপরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ)’-এ পদায়ন করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বরিশালে উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের বিশেষায়িত জাহাজ ‘অগ্নি যোদ্ধা’র জন্য বরাদ্দকৃত হাজার হাজার লিটার জ্বালানি তেল কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ অন্যতম। অভিযোগকারীদের দাবি, জাহাজটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ করা জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
সবচেয়ে বেশি আলোচনার সৃষ্টি করে বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য বরাদ্দ করা ত্রাণের বিস্কুট আত্মসাতের অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিলে দুর্গত মানুষের মধ্যে বিতরণের জন্য ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ করা হয়। ওই সময় বরিশাল অঞ্চলে সংরক্ষিত ত্রাণের বিস্কুটের একটি অংশ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। পরে সেনাবাহিনীর একটি অভিযানে এ-সংক্রান্ত অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গিয়েছিল বলেও অভিযোগকারীদের দাবি। ঘটনাটি সে সময় মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে বলে জানা গেছে।
অভিযোগগুলো সত্য হলে বিষয়গুলো শুধু প্রশাসনিক অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ বিতরণ এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক শৃঙ্খলার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট। বিশেষ করে দুর্যোগকালে মানুষের জন্য বরাদ্দ করা ত্রাণসামগ্রী নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে এমন অভিযোগ ওঠার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কিন্তু অভিযোগগুলোর পরও মিজানুর রহমানকে বরিশাল থেকে ঢাকায় এনে অধিদপ্তরের প্রশাসন ও অর্থ শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘উপপরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ)’ পদটি অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কার্যক্রম, জনবল ব্যবস্থাপনা, আর্থিক বিষয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে এমন একটি পদে দায়িত্ব দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো যাচাই করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, গুরুতর অভিযোগের পরও কোনো দৃশ্যমান তদন্ত ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে নেতিবাচক বার্তা তৈরি করছে। তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা থাকলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত; আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও পরিষ্কার করা দরকার। কিন্তু কোনো পক্ষেই কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এদিকে, মিজানুর রহমানকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের পেছনে কোনো বিশেষ প্রভাব বা প্রশাসনিক সুপারিশ কাজ করেছে কি না, তা নিয়েও অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে। তবে এ ধরনের আলোচনা ও অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে বর্তমান মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জায়েদ কামালকে প্রভাবিত করে পদটি পাওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তারও কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে; তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা—তা নির্ধারণে দ্রুত একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করা উচিত। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগের প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ, সরকারি ত্রাণ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত শুধু অভিযুক্ত কর্মকর্তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য নয়, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখার জন্যও জরুরি।
ফলে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটন, অভিযোগের নথিপত্র যাচাই এবং তার পদায়নের প্রশাসনিক ভিত্তি স্পষ্ট করার দাবি জোরালো হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তদন্তের মাধ্যমে তাকে দায়মুক্ত করার মধ্য দিয়েই এ বিতর্কের অবসান ঘটানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।