ঢাকা, শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৫:১৫:২৫ PM

ছাত্রদল নিয়ে প্রত্যাশা, স্বচ্ছ নেতৃত্বের খোঁজে বিএনপি

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
07-08-2026 03:49:34 PM
ছাত্রদল নিয়ে প্রত্যাশা, স্বচ্ছ নেতৃত্বের খোঁজে বিএনপি

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা ঘিরে সংগঠনজুড়ে বাড়ছে আলোচনা ও প্রত্যাশা। বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা এবার স্বচ্ছতা, ত্যাগ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করতে চান বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। দলীয় সূত্রের দাবি, ছাত্রদলের সাংগঠনিক পুনর্গঠনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। অতীতের মতো ব্যক্তিনির্ভর লবিং, তদবির বা সিন্ডিকেটের পরিবর্তে মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রম, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা এবং নেতাদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি যাচাই-বাছাই করে নেতৃত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি আগস্ট মাসের প্রথমার্ধেই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা হতে পারে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশের ছাত্ররাজনীতির বাস্তবতা এখন আগের তুলনায় অনেকটাই পরিবর্তিত। শুধু রাজপথের আন্দোলন নয়, শিক্ষার্থীদের অধিকার, নীতি-নির্ধারণী বিতর্ক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বেও সক্ষমতা দেখাতে পারবে—এমন নেতৃত্বই এখন সময়ের দাবি। সেই বিবেচনায় ছাত্রদলকে আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও মেধাভিত্তিক সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বিএনপি। বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসিরের নেতৃত্বাধীন কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ১ মার্চ। এই কমিটির সময় বিভিন্ন ইউনিটে কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে একাধিক জেলায় বিক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়। বঞ্চিত নেতাকর্মীদের অভিযোগ ছিল, আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত অনেক ত্যাগী নেতা মূল্যায়ন পাননি। পাশাপাশি নিষ্ক্রিয়, অছাত্র কিংবা বিতর্কিত ব্যক্তিদের পদায়নের অভিযোগও ওঠে, যা বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক অস্থিরতার জন্ম দেয়। এমন পরিস্থিতিতে নতুন কমিটিকে ঘিরে নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। সভাপতি পদে আলোচনায় থাকা নেতাদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান সিনিয়র সহ-সভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া, সহ-সভাপতি এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েল এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান। এছাড়া মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ, এইচ এম আবু জাফর, শাফি ইসলাম, খোরশেদ আলম সোহেল এবং ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের সাবেক ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানের নামও আলোচনায় রয়েছে। আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অনুসারীদের দাবি, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি তিনি বিতর্কমুক্ত ভাবমূর্তি ধরে রেখেছেন। ছাত্রলীগের হামলায় আহত হওয়া, কারাবরণ এবং সাম্প্রতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার বিষয়টিও তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। অন্যদিকে এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং একাধিক মামলা ও কারাবরণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমান উল্লাহ আমানও আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি ক্যাম্পাসভিত্তিক ইতিবাচক ও জবাবদিহিমূলক ছাত্ররাজনীতির পক্ষে অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। সাধারণ সম্পাদক পদেও একাধিক নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমান যুগ্ম সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসানকে সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার পাশাপাশি সালেহ মো. আদনান, ফারুক হোসেন, শরিফ প্রধান শুভ, তরিকুল ইসলাম তারিক, গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, নাহিদুজ্জামান শিপন, মিনহাজ আহমেদ প্রিন্সসহ আরও কয়েকজন নেতা আলোচনায় রয়েছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি—এই তিনটি বিষয়ই তাদের মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি হতে পারে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। এবারের নেতৃত্ব নির্বাচনে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের নেতারাও গুরুত্ব পাচ্ছেন। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ থেকে উঠে আসা ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, ছাত্রনেতা কাজী জিয়া উদ্দিন বাসেত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের এম. রাজীবুল ইসলাম তালুকদার বিন্দু এবং শাহরিয়ার হক মজুমদার শিমুলের নামও সম্ভাব্য নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি নেতৃত্ব নির্বাচনে বিকেন্দ্রীকরণ এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের ইতিবাচক ইঙ্গিত। বিএনপির উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলোর দাবি, ছাত্রদলের পুনর্গঠন কেবল একটি সাংগঠনিক পরিবর্তন নয়; বরং যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠনেও একই ধরনের পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান রাখা কিন্তু বিভিন্ন কারণে মূল্যায়ন না পাওয়া নেতাদের সামনে আনার উদ্যোগও এর অংশ বলে জানা গেছে। ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, নতুন নেতৃত্ব এমন হওয়া উচিত যারা দেশ, দল ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে নিবেদিত এবং রাজপথ ও ক্যাম্পাস—উভয় ক্ষেত্রেই কার্যকর নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। একইভাবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক গোলাম হাফিজের মতে, ছাত্ররাজনীতিতে প্রকৃত মেধাবী, দায়িত্বশীল এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে সংগঠনের গুণগত পরিবর্তন সম্ভব। সব মিলিয়ে ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি শুধু সাংগঠনিক নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়, বরং বিএনপির ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার কতটা মিল রেখে নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করা হয় এবং সেই নেতৃত্ব সংগঠনকে কতটা ঐক্যবদ্ধ ও গতিশীল করতে সক্ষম হয়।