ঢাকা, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৯:০৪:২৬ PM

কোটি টাকা আত্মসাৎ, ১১ মামলায় ওয়ারেন্ট

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
14-09-2026 07:39:54 PM
কোটি টাকা আত্মসাৎ, ১১ মামলায় ওয়ারেন্ট

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পরিচয়ে ভিজিটিং কার্ড ছাপিয়ে প্রতারণার পাশাপাশি গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলী পরিচয়ে মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) চাকরিচ্যুত চেইনম্যান মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনায় দায়ের করা ১১টি মামলায় এরই মধ্যে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরও কৌশল পরিবর্তন করে নতুন করে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তেও তার বিরুদ্ধে প্রতারণার সত্যতা পাওয়ার কথা জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তোলা ছবি ব্যবহার করেও তিনি প্রতারণা করছেন। তবে একের পর এক অভিযোগ ও মামলার পরও রহস্যজনক কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েও মুজিবুর রহমান প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনি বর্তমানে রাজধানীতে অবস্থান করে প্রতারণা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্যকে ‘ম্যানেজ’ করে গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলছেন তিনি এবং এসব সদস্য তাকে সহযোগিতা করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, পূর্বাচলে জমি বিক্রির কথা বলে মোস্তাফিজুর রহমান নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৩ কোটি ৭ লাখ টাকা নেন মুজিবুর। পরে জমি রেজিস্ট্রি না করে ওই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে স্ট্যাম্প ও স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগে উল্টো ৬ কোটি টাকার একটি মামলা করেন তিনি। পিবিআইয়ের তদন্তে ওই মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে বলে জানা গেছে। এরপরও মোস্তাফিজুরের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করা হয়, সেটিও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘পূর্বাচলে একটি প্লটের জন্য ৩ কোটি ৭ লাখ টাকা দেওয়ার পরও জমি রেজিস্ট্রি করা হয়নি। মুজিবুর বারবার সময় নিয়েছেন। এতে আমি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। বিভিন্ন সময় আমাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।’ এ ঘটনায় তিনি রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলে জানান।

এর আগে পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মুজিবুর একজন বড় মাপের প্রতারক। তদন্তে প্রমাণ হয়েছে, তিনি যেসব তথ্যের ভিত্তিতে মামলা করেছেন, সেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। অনেক মানুষের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে।’

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, মুজিবুর শুধু সাধারণ মানুষের সঙ্গেই প্রতারণা করেননি, পুলিশের অনেক সদস্যের সঙ্গেও প্রতারণা করেছেন। এমনকি পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আদালতে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পুলিশ সদর দপ্তরের অভিযোগ সেলে ‘মিথ্যা তথ্য’ দিয়ে অভিযোগ করার পর তদন্তে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। ওই ঘটনায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করলেও জামিনে বেরিয়ে আবারও প্রতারণা শুরু করেন বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

অভিযোগ রয়েছে, তার প্রতারণার শিকার হয়ে এক কলেজ শিক্ষক বর্তমানে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া একজন বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকের ব্যবসার ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ পিবিআই তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।

এর আগে ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর ঘুষ, দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে চেইনম্যান মুজিবুর রহমানকে বরখাস্ত করা হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় তার বহুমুখী পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগ। রাজউকের প্লট দেওয়ার কথা বলে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পিবিআইয়ের তদন্তেও তার বিরুদ্ধে জালিয়াতির বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়ার কথা জানা গেছে। এক ভুক্তভোগীকে টাকা পরিশোধের জন্য তিনি কয়েকটি চেক দেন। তবে সেসব চেক ব্যাংকে উপস্থাপনের পর ডিজঅনার হয়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে মুজিবুর রহমান বলেন, ‘ফ্ল্যাট ও গাড়ি থাকার বিষয়টি আমি স্বীকার করছি। তবে এগুলো ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে কেনা হয়েছে। আর প্রতারণার অভিযোগ পুলিশ তদন্ত করছে। এখন পর্যন্ত পুলিশ আমার বিরুদ্ধে কোনো প্রতারণার প্রমাণ পায়নি।’

পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, মুজিবুর রহমান বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করেছেন। কখনো নিজেকে রাজউকের কর্মকর্তা, কখনো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আবার কখনো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পার্সোনাল অফিসার হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একসময় তিনি আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্য ছিলেন বলে দাবি করলেও বর্তমানে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন বলে প্রচারণা চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তার প্রতারণার শিকার বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিটিভির সাবেক পরিচালক শেখ আব্দুল সালেক বলেন, ‘প্রতারক মুজিবুর বহু সহজ-সরল মানুষকে তার প্রতারণার ফাঁদে ফেলেছেন। তার বিরুদ্ধে আদালতের এতগুলো ওয়ারেন্ট থাকার পরও তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। এত কিছুর পরও নতুন করে তার প্রতারণার বিভিন্ন ঘটনা আমরা জানতে পেরেছি।’