ঢাকা, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৯:১১:৫৩ PM

কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি, অভিযোগের মুখে সোহাগ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
08-09-2026 07:19:07 PM
কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি, অভিযোগের মুখে সোহাগ

সরকারের রাজস্ব আহরণে আইন ও বিধি যথাযথভাবে প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা বেনাপোল কাস্টমস হাউসকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দুর্বল তদারকি, শুল্ক ফাঁকির ঘটনায় নীরব প্রশ্রয় এবং অসাধু কর্মকর্তা, আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের যোগসাজশের কারণে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে একটি প্রভাবশালী চক্র অবৈধভাবে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বেনাপোল কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্ধারিত সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, আমদানি কমে যাওয়া, শুল্ক ফাঁকির প্রবণতা এবং কাস্টমস ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এ ঘাটতির অন্যতম কারণ।

সম্প্রতি ভারত থেকে আমদানিকৃত একটি ইমিটেশন জুয়েলারির চালানে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা ধরা পড়ার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বেনাপোল কাস্টমস সূত্র জানায়, ঢাকার চকবাজারের ‘টি এল ট্রেডিং’-এর মালিক মোস্তাফিজুর রহমান ভারত থেকে ৬৮৭ প্যাকেজ ইমিটেশন জুয়েলারি আমদানি করেন। চালানটির নিট ওজন ছিল ১৬ হাজার ৮৫৪ কেজি। পণ্য খালাসের জন্য আমদানিকারকের পক্ষে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট হিসেবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করেন সোহাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও ওরিয়েন্টাল ট্রেডিং সেন্টারের মালিক আল আমিন সোহাগ।

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চালানটি পরীক্ষা করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ঘোষণায় প্রকৃত আমদানি মূল্য গোপন করার তথ্য পায়। একই সঙ্গে ঘোষিত ওজনের তুলনায় প্রায় ২ হাজার ৪০ কেজি অতিরিক্ত উচ্চ শুল্কমূল্যের পণ্য পাওয়া যায়। পরে আমদানিকারকের বিরুদ্ধে জরিমানা করা হলেও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আল আমিন সোহাগের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার মো. রাহাত হোসেন বলেন, কাস্টমস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী আমদানিকারকের বিরুদ্ধে ন্যায়নির্ণয় করে জরিমানা করা হয়েছে। তবে শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেননি।

এ ঘটনায় বেনাপোল কাস্টমসের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মাত্র ৫১ লাখ টাকা মূল্যের পণ্য ঘোষণা দিয়ে প্রায় ৬ কোটি টাকার পণ্য খালাসের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া সহকারী কমিশনার অতুল গোস্বামী ও রাজস্ব কর্মকর্তা সনজুর বিরুদ্ধে ভারতীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান জি এন এক্সপোর্টার্সের ‘ইনসুলেটিং ভার্নিশ ফর কপার’ পণ্যের ২০টির বেশি চালানে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, একাধিক বিল অব এন্ট্রিতে প্রকৃত মূল্য বিবেচনা না করে প্রতি ইউনিট ১ দশমিক ২০ ডলার মূল্যে শুল্কায়ন করে পণ্য খালাস দেওয়া হয়েছে।

গত ছয় মাসে বেনাপোল কাস্টমসে মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকির আরও কয়েকটি ঘটনা ধরা পড়ে। ৯ মার্চ ২০২৬ আরাফাত এন্টারপ্রাইজের নামে আমদানি করা ১৭ টন পাটবীজ জব্দ করা হয়। ১২ মার্চ এনএসআইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে বেকিং পাউডারের ঘোষণায় আনা শাড়ি, থ্রিপিস, কসমেটিকস ও কেমিক্যাল আটক করা হয়। ১৫ জুন টি এস ইন্টারন্যাশনালের চালান থেকে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের শাড়ি ও ফেসওয়াশ ক্রিম জব্দ করা হয়। এ ছাড়া শিল্পকারখানার কাঁচামাল ঘোষণার আড়ালে অবৈধ পণ্য আমদানির অভিযোগে আরাফাত এন্টারপ্রাইজের আরেকটি চালানও আটক করা হয়।

এর আগে ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বেনাপোল কাস্টমস হাউসে অভিযান চালিয়ে ২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ঘুষসহ রাজস্ব কর্মকর্তা শামীমা আক্তার ও তার সহযোগী হাসিবুর রহমানকে আটক করে। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

এদিকে ২২ জুন ২০২৬ রাতে জব্দ করা ভারতীয় উচ্চ শুল্কমূল্যের পণ্য কাস্টমস গুদাম থেকে পাচারের সময় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জিকে বিজিবি আটক করে। পরে তাকেও কারাগারে পাঠানো হয়।

বেনাপোল কাস্টমসের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর কাস্টমসের সুরক্ষিত ভল্ট ভেঙে ১৯ কেজি ৩৩৮ গ্রাম সোনা চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সিআইডির তদন্তে সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয় এবং মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং রাজস্ব আদায়ে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।