ঢাকা, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৩:৫২:২৪ AM

৪৭ লাখ টাকা লোপাটে,অচল ১০০ কোটির যন্ত্রপাতি

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
09-08-2026 04:08:05 PM
৪৭ লাখ টাকা লোপাটে,অচল ১০০ কোটির যন্ত্রপাতি

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সচল যন্ত্রপাতি বিকল দেখিয়ে মেরামতের নামে প্রায় ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ডা. মো. শফিউর রহমান, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা এবং স্টোরকিপার মো. রফিকুল ইসলামের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে এসেছে। একই সময়ে হাসপাতালটিতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা মূল্যের তিন শতাধিক জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর ধরে অচল পড়ে রয়েছে। এতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিপুল সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত রোগী চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালে আসেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি বিকল থাকায় রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতাল বা অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে।

সচল যন্ত্র মেরামতের নামে ৪৭ লাখ টাকা

হাসপাতালের নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য বরাদ্দ ছিল ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়। পরবর্তী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মেরামতের জন্য ৯৫ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় দেখানো হয় ১৫ লাখ ২১ হাজার টাকা। দুই অর্থবছর মিলিয়ে মেরামতের নামে মোট ৪৭ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।

পেশেন্ট মনিটর, ইসিজি মেশিন, ওটি টেবিল ও ডায়াথার্মি মেশিনসহ বিভিন্ন যন্ত্র মেরামতের নামে সাতটি কোটেশনের মাধ্যমে এসব অর্থ ব্যয় দেখানো হয়। প্রতিটি বিলে তৎকালীন পরিচালক ডা. মো. শফিউর রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট বায়োমেডিকেল প্রকৌশলীদের দাবি, এসব যন্ত্র মেরামতের বিষয়ে তারা কোনো সম্মতি দেননি।

হাসপাতালের প্রধান বায়োমেডিকেল প্রকৌশলী মোহাম্মদ তৌহিদুদ জামান বলেন, যেসব যন্ত্র মেরামত দেখানো হয়েছে, সেগুলো নষ্টই হয়নি। কোনো যন্ত্র নষ্ট হলে প্রথমেই বায়োমেডিকেল টিমের কাছে বিষয়টি আসার কথা। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে তারা কিছুই জানতেন না। তার অভিযোগ, ভুয়া কোটেশন তৈরি করে বিল তুলে অর্থ ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হয়েছে।

তৌহিদুদ জামান আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন পরিচালক শফিউর রহমানের বিরুদ্ধে অডিট আপত্তিও এসেছে।

স্টোরকিপারের স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ

হাসপাতালের বিভিন্ন মেরামত ও মালামাল সরবরাহের কাজ পেয়েছে ‘এম/এস এস.আর ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। দরপত্রে প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা দেওয়া হয়েছে মিরপুরের পশ্চিম শেওড়াপাড়ার ৩১৪-৩১৫ নম্বর ভবনের ৪/বি ফ্ল্যাট। তবে সরেজমিনে সেখানে গিয়ে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ওই নামে কোনো অফিসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ভবনটির বাসিন্দা ও স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি পুরোপুরি আবাসিক ভবন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি হাসপাতালের স্টোরকিপার মো. রফিকুল ইসলামের স্ত্রীর নামে খোলা। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় স্ত্রীর নামে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাসপাতালের কাজ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রফিকুল ইসলাম বলেন, তার স্ত্রী স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে পারেন।

বায়োমেডিকেল প্রকৌশলীদের স্বাক্ষর ছাড়া এবং মালামাল বুঝে না পেয়েও কীভাবে বিল পরিশোধ করা হলো—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি তিনি। সচল যন্ত্র নষ্ট দেখিয়ে ভুয়া বিল তৈরির অভিযোগের বিষয়ে রফিকুল বলেন, ক্যাশ থেকে টাকা নিয়ে কাজ করা হয়েছিল এবং সেই টাকা সমন্বয়ের জন্য পরিচালকের নির্দেশে বিল করা হয়েছে।

ব্যবহৃত গ্লাভস পুনরায় সরবরাহের অভিযোগ

হাসপাতালের স্টোর ব্যবস্থাপনায় আরও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত সার্জিক্যাল প্রসিডিউর গ্লাভস নতুন করে প্যাকেটজাত করে স্টোরে সরবরাহ করা হতো। এ ধরনের অনিয়ম আড়াল করতে নার্সদের ব্যবহৃত গ্লাভস না কাটার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

হাসপাতালে বছরে অন্তত ১০ হাজার জোড়া এ ধরনের গ্লাভসের প্রয়োজন হয়। প্রতি জোড়ার দাম প্রায় ১৫০ টাকা হিসেবে বছরে এ খাতে ব্যয় হয় প্রায় ১৫ লাখ টাকা। একাধিক নার্সের অভিযোগ, ব্যবহৃত বা সংক্রমিত গ্লাভস পুনরায় ব্যবহার করা রোগীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসকদের আপত্তির পর গত বছর থেকে উন্নতমানের গ্লাভস সরবরাহ শুরু হয় বলে জানা গেছে।

অচল ১০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি

অন্যদিকে হাসপাতালটিতে বছরের পর বছর ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে তিন শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি। এর মধ্যে রয়েছে ভেন্টিলেটর, এমআরআই, সিটি স্ক্যান, এক্স-রে, এন্ডোস্কপি, কোলনোস্কপি, পেশেন্ট মনিটর, আল্ট্রাসাউন্ড, অক্সিজেন ও এয়ার জেনারেটরসহ বিভিন্ন জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম।

২০১৬ সালে প্রায় ১৮ কোটি টাকায় কেনা হাসপাতালের একমাত্র এমআরআই যন্ত্রটি এক-দুই বছরের মধ্যেই বিকল হয়ে যায়। এরপর সেটি আর সচল করা হয়নি। দুটি সিটি স্ক্যানের একটি প্রায় পাঁচ বছর ধরে অচল। চার কোটি টাকা মূল্যের এ যন্ত্রটি চালু করার কার্যকর উদ্যোগও নেই।

এ ছাড়া প্রায় ৩০ লাখ টাকা করে মূল্যের ৪০টি ভেন্টিলেটর অচল পড়ে আছে। ছয় কোটি টাকা মূল্যের দুটি পোর্টেবল এক্স-রে, অন্তত সাত কোটি টাকা মূল্যের সাতটি এন্ডোস্কপি ও কোলনোস্কপি, দেড় কোটি টাকা মূল্যের ৩০টির বেশি পেশেন্ট মনিটর, ৭ কোটি ২ লাখ টাকা মূল্যের ১৪টি আল্ট্রাসাউন্ড, ৮০ লাখ টাকা মূল্যের দুটি ইকো মেশিন, এক কোটি টাকা মূল্যের ম্যামোগ্রাফি এবং চার কোটি টাকা মূল্যের অক্সিজেন ও এয়ার জেনারেটরও অকেজো অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় আট কোটি টাকা মূল্যের ১০টি ল্যাপারোস্কোপিও অচল।

রাজস্ব আয় নিয়েও প্রশ্ন

হাসপাতালের রাজস্ব আদায়ে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে অটোমেশন চালুর পর রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে হাসপাতালের রাজস্ব আয় ছিল ৫ কোটি ২ লাখ ৪১ হাজার ৭৭৫ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ৬ কোটি ৯৯ লাখ ৮৫ হাজার ১৫০ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৪৩ হাজার ৩৭৫ টাকা।

হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, অটোমেশনের আগে রাজস্ব আদায়ের একটি অংশ অনিয়মের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হতো। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

বর্তমান ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা বলেন, সবকিছু নিয়ম মেনেই হয়েছে। সাবেক পরিচালক ডা. মো. শফিউর রহমানও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার সময়ে কাগজপত্রে কোনো গরমিল ছিল না। তার দাবি, কোনো যন্ত্র নষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে রিকুইজিশন দেওয়া হয়, বায়োমেডিকেল প্রকৌশলীরা যাচাই-বাছাই করেন এবং ব্যবহারকারীর সন্তুষ্টির পর বিল পরিচালকের কাছে আসে। তাই অনিয়মের সুযোগ নেই বলে দাবি করেন তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমী বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্ত্রী একই প্রতিষ্ঠানে ঠিকাদারি করলে বিষয়টি তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও বিষয়টি তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

তবে অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, অচল যন্ত্রপাতি দ্রুত সচল করা এবং সরকারি অর্থের সম্ভাব্য অপচয় বা আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা এখন জরুরি। কারণ একদিকে কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম অচল পড়ে আছে, অন্যদিকে সচল যন্ত্র মেরামতের নামে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ—দুই ঘটনাই সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।