ঢাকা, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৩:৫০:০২ AM

নম্বর প্লেটের নামে ১,৫০০ কোটি আদায়

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
09-08-2026 04:30:38 PM
নম্বর প্লেটের নামে ১,৫০০ কোটি আদায়

চুরি হওয়া গাড়ি উদ্ধার, টোল আদায় ও যানবাহন ট্র্যাকিংসহ আধুনিক নানা সেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১২ সালে ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (আরএফআইডি) ট্যাগ চালু করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। গত প্রায় ১৪ বছরে ৫৪ লাখের বেশি যানবাহনে ডিজিটাল নম্বর প্লেট সরবরাহ করে সংস্থাটি আদায় করেছে ১ হাজার ৫১৬ কোটি টাকার বেশি। তবে এত বিপুল অর্থ আদায়ের পরও প্রতিশ্রুত সেবার ন্যূনতম সুবিধাও পাচ্ছেন না অধিকাংশ যানবাহন মালিক।

প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সমন্বয় না করেই শুধু ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগ সরবরাহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে চুরি যাওয়া গাড়ি শনাক্ত বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল আদায়ের মতো মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়নি। এরই মধ্যে নতুন করে গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার বসানো বাধ্যতামূলক করেছে বিআরটিএ। আগামী দিনে এ উদ্যোগও আরএফআইডি প্রকল্পের মতো ব্যর্থ হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।

যেভাবে শুরু

২০১২ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে সব ধরনের যানবাহনের জন্য ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগ বাধ্যতামূলক করে বিআরটিএ। সে সময় বলা হয়েছিল, ডিজিটাল নম্বর প্লেটযুক্ত কোনো গাড়ি চুরি হলে আরএফআইডি প্রযুক্তির মাধ্যমে সেটি শনাক্ত ও উদ্ধারে সহায়তা করা যাবে। কোনো অপরাধে গাড়ি ব্যবহার করা হলেও প্রযুক্তির মাধ্যমে তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও ফ্লাইওভারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল আদায়ের ব্যবস্থা চালুরও পরিকল্পনা ছিল। মোটরসাইকেল ও তিন চাকার যানবাহনের জন্য ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগের ফি নির্ধারণ করা হয় ২ হাজার ২৬০ টাকা। চার চাকার যানবাহনের ক্ষেত্রে এই ফি ছিল ৪ হাজার ৬২৮ টাকা।

১,৫১৬ কোটি টাকা আদায়

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণির যানবাহনের জন্য মোট ৫৪ লাখ ৭১ হাজার ৪৮৯টি আরএফআইডি ট্যাগযুক্ত ডিজিটাল নম্বর প্লেট সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯ লাখ ৭০ হাজার ৮৬৯টি নম্বর প্লেট যানবাহনে সংযোজন করা হয়েছে। আরও ৫ লাখ ৬২০টি নম্বর প্লেট বিভিন্ন সার্কেল অফিসে পড়ে আছে।

এসব নম্বর প্লেটের বিপরীতে যানবাহন মালিকদের কাছ থেকে বিআরটিএ আদায় করেছে ১ হাজার ৫১৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৭৪৪টি ভারী যানবাহন থেকে আদায় হয়েছে ১১৫ কোটি ১১ লাখ ৮৭ হাজার ২৩২ টাকা। ৯ লাখ ৩৩ হাজার ২৮৭টি হালকা ও মধ্যম যানবাহন থেকে আদায় হয়েছে ৪৩১ কোটি ৯২ লাখ ৫২ হাজার ২৩৬ টাকা। আর ৪২ লাখ ৮৯ হাজার ৪৫৮টি মোটরসাইকেল ও থ্রি-হুইলার থেকে আদায় হয়েছে ৯৬৯ কোটি ৪১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

অবকাঠামো নেই, সেবাও নেই

ডিজিটাল নম্বর প্লেট চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল চুরি যাওয়া গাড়ি দ্রুত শনাক্ত ও উদ্ধার করা। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও এ জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। প্রাথমিক পরিকল্পনায় সারা দেশে ৯৪টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট স্থাপনের কথা থাকলেও চলতি বছরের ২৯ জুলাই পর্যন্ত স্থাপন করা হয়েছে মাত্র ১২টি। সবগুলোই ঢাকার মধ্যে। এসব চেকপোস্ট পর্যবেক্ষণের জন্যও পৃথক জনবল নেই।

রাজধানীতে কথা বলা কয়েকজন ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল মালিকের অধিকাংশই জানেন না ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগের কাজ কী। ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক শুব্রত মন্ডল জানান, তাঁর মোটরসাইকেল চুরি হওয়ার পর থানায় জিডি করেও আট মাসের বেশি সময়ে সেটি উদ্ধার করতে পারেননি। ডিজিটাল নম্বর প্লেটের মাধ্যমে চুরি যাওয়া গাড়ি শনাক্ত করা সম্ভব—এ বিষয়টিও তিনি জানতেন না।

পরিকল্পনায় ছিল আরও সুবিধা

ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি করে বিআরটিএ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আরএফআইডির মাধ্যমে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়ার কথা ছিল। ১১ মিটার দূর থেকে চিপ স্ক্যান করে গাড়ির গতিপথ শনাক্ত করার পাশাপাশি বিআরটিএর সার্ভারের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সরাসরি সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনাও ছিল।

কিন্তু ১৪ বছরেও বিআরটিএর কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে পুলিশের ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন হয়নি। ফলে পুলিশ আরএফআইডি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারছে না। চুরি যাওয়া গাড়ি উদ্ধার ও অপরাধ দমনে পুলিশকে নিজস্ব প্রযুক্তি ও সোর্সের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. নিয়াজ মেহেদী বলেন, আরএফআইডি প্রযুক্তি না থাকায় পুলিশ নিজস্ব প্রযুক্তি ও সোর্স ব্যবহার করে অপরাধ দমন এবং চুরি যাওয়া গাড়ি উদ্ধার করছে।

এবার গণপরিবহনে জিপিএস

আরএফআইডি প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার বাধ্যতামূলক করেছে বিআরটিএ। গত ১১ জুন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে ১ আগস্ট থেকে গণপরিবহনে জিপিএস ডিভাইস সংযোজন ও সচল রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জিপিএস সংযুক্ত ও সচল থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই গণপরিবহনের রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ দেওয়া বা নবায়ন করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি চালু করা হলেও মানুষ এর সুফল পায়নি। টোল আদায়ের জন্য আরএফআইডি ট্যাগ থাকলেও প্রয়োজনীয় স্থানে রিডার স্থাপন করা হয়নি। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়নি।

তিনি বলেন, গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগটি ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে যানবাহনের বিপুল তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং জিপিএস ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আন্তরিক হতে হবে। তা না হলে নতুন এই উদ্যোগও আরএফআইডি প্রকল্পের মতো ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।