ঢাকা, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৩:৫১:০৬ AM

সোনারগাঁয়ে ছাত্রীকে প্রকাশ্যে লাথি:কিশোর আটক

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
09-08-2026 03:56:10 PM
সোনারগাঁয়ে ছাত্রীকে প্রকাশ্যে লাথি:কিশোর আটক

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে স্কুলছাত্রীকে প্রকাশ্যে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত কিশোর দিলশাদ হোসেনকে আটক করেছে পুলিশ। শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে রংপুরে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। পরে অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় আদালতের মাধ্যমে তাকে বাবা-মায়ের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ছয় মাস তার নিয়মিত কাউন্সেলিং ও প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জানা গেছে, প্রায় এক মাস আগে সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুর ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তানিসা আক্তার ও সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী মিম আক্তার কাঁচপুরে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়সংলগ্ন ওয়াকওয়ে এলাকায় ঘুরতে যায়। এ সময় স্থানীয় কিশোর দিলশাদ হোসেন কোনো কারণ ছাড়াই পেছন থেকে তানিসা আক্তারকে সজোরে লাথি মারে। এ ঘটনায় তানিসা প্রতিবাদ করলে দিলশাদ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে দৌড়ে এসে তাকে আবারও লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দেয়।

ঘটনার পুরো দৃশ্য দিলশাদের এক সহযোগী মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটক ও ফেসবুকে আপলোড করা হলে অল্প সময়ের মধ্যেই তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি দেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার সৃষ্টি হয়। বিষয়টি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের নজরে এলে অভিযুক্ত কিশোরকে আটক করতে পুলিশ তৎপর হয়ে ওঠে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সির নির্দেশনায় সোনারগাঁ থানা পুলিশ অভিযুক্তকে আটকের জন্য বিশেষ অভিযান শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ তার অবস্থান শনাক্ত করে। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার সকালে রংপুরের একটি স্থান থেকে দিলশাদ হোসেনকে আটক করা হয়। দিলশাদ কাঁচপুর রায়েরটেক এলাকার ভাড়াটিয়া রিকশাচালক সাফিউল ইসলামের ছেলে বলে জানা গেছে।

এদিকে স্কুলছাত্রীকে লাঞ্ছিত করার ঘটনার পর নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে ভুক্তভোগী তানিসার বিদ্যালয়ে থাকা নিয়ে। তানিসার বাবা, যিনি পেশায় একজন গার্মেন্ট শ্রমিক, অভিযোগ করেছেন, স্কুল চলাকালে বিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থান করার কারণ দেখিয়ে তার মেয়েকে টিসি (ট্রান্সফার সার্টিফিকেট) দিয়ে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এতে মেয়ের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন বলে দাবি করেন।

তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগীর পরিবারের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কাঁচপুর ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিন সরকার এবং এডহক ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. মহিউদ্দিন মিয়া জানান, ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে টিসি দেওয়া হয়নি। তাঁদের দাবি, তানিসা ও মিম প্রায়ই নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিত থাকত। বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাদের অভিভাবকদের ডেকে সতর্কতামূলক চিঠি দেওয়া হয়েছে। টিসি দেওয়ার অভিযোগটি সঠিক নয় বলেও তাঁরা দাবি করেন।

অভিযুক্ত কিশোরের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেলা সমাজসেবা বিভাগের প্রবেশন অফিসার নূর ফারজানা জানান, ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত অভিযোগ করা হয়নি। এ ছাড়া অভিযুক্তের বয়স কম হওয়ায় প্রচলিত আইন ও শিশু আইনের বিধান অনুযায়ী তাকে আদালতের মাধ্যমে বাবা-মায়ের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, কিশোরটিকে শাস্তির পরিবর্তে সংশোধনের সুযোগ দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আগামী ছয় মাস প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে রাখা হবে। এ সময়ে তার নিয়মিত কাউন্সেলিং করা হবে। পাশাপাশি কিশোর ও তার অভিভাবকদের প্রতি মাসে দুই থেকে তিনবার প্রবেশন কর্মকর্তার কাছে বাধ্যতামূলকভাবে হাজিরা দিতে হবে।

সার্বিক বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, শিশু-কিশোরদের অপরাধের ক্ষেত্রে শুধু শাস্তি দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য নয়; বরং তাদের ভুল বুঝিয়ে সংশোধনের সুযোগ করে দেওয়াই শিশু আইনের মূল চেতনা। অভিযুক্ত কিশোর অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ না থাকায় প্রচলিত আইনের বিধান অনুসরণ করে তাকে প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে, কাউন্সেলিং ও তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে কিশোরটি নিজের ভুল বুঝতে পারবে এবং ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে এমন ঘটনা যাতে পুনরায় না ঘটে, সে বিষয়ে পরিবার, বিদ্যালয় ও স্থানীয় প্রশাসনকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।