বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে নতুন করে চার নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শনিবার (১৫ আগস্ট) দলটির পক্ষ থেকে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। নতুন চার সদস্য হলেন—বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, ড্যাবের প্রধান উপদেষ্টা ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার এবং সাবেক সরকারি কর্মকর্তা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ।
বিএনপি জানিয়েছে, দলের সাংগঠনিক গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং দলীয় সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে এই চার নেতাকে জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে মনোনীত করা হয়েছে। দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে যুক্ত হওয়া রিজভী ও আমান দুজনই ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা পুরনো ও পরীক্ষিত নেতা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবরণের মধ্য দিয়ে তারা বিএনপির রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন।
রুহুল কবির রিজভী: রাজপথের আন্দোলন থেকে স্থায়ী কমিটিতে
রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক পথচলা শুরু ছাত্রজীবনেই। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর তিনি বামপন্থী সংগঠন বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতিতে প্রবেশ করেন। রাজশাহী সরকারি কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে যোগ দেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতিও হন।
১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষে অনুষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে রিজভী আহমেদ ভিপি নির্বাচিত হন। এরপর জাতীয় রাজনীতিতে তার সক্রিয়তা আরও বাড়তে থাকে।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজপথের সক্রিয় নেতা হিসেবে রিজভীর ভূমিকার কথা বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি গুলিবিদ্ধও হন বলে দলীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে রিজভী একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বহু মামলা হয়েছে। দলটির কঠিন সময়ে তিনি কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে থেকে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন। কারাগারে থেকেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে তার। তিনি কারাগার থেকে এলএলএম পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন বলেও এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন।
২০১৬ সালের বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর রিজভী জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। পরবর্তী সময়ে তিনি দলের মুখপাত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন, বিবৃতি এবং দলীয় কর্মসূচি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার কারণে তিনি বিএনপির অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত হন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দলের প্রতি ভূমিকার ধারাবাহিকতায় এবার জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে তাকে মনোনীত করা হলো। সাম্প্রতিক সময়ে দলের নির্বাচনী কর্মকাণ্ডেও তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
আমান উল্লাহ আমান: ডাকসুর ভিপি থেকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতা
রিজভীর মতো আমান উল্লাহ আমানের রাজনৈতিক পরিচয়ের শুরু ছাত্ররাজনীতিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০-৯১ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে তিনি ভিপি নির্বাচিত হন।
ছাত্ররাজনীতি থেকে দ্রুত জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসেন আমান। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৩ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের সময় তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ২০০১ সালে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আমান উল্লাহ আমানকে নানা মামলা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার পাশাপাশি চাঁদাবাজির মামলাও হয়েছে। ২০০৭ সালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় করা একটি চাঁদাবাজির মামলায় তাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল; পরে হাইকোর্ট সেই সাজা থেকে তাকে খালাস দেন।
এ ছাড়া ২০০৭ সালে সম্পদের তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আমান ও তার স্ত্রী সাবেরা আমানের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করে। ওই মামলায় বিশেষ জজ আদালত আমানকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। পরে উচ্চ আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ের বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মামলাটি গড়ায় এবং সর্বশেষ আপিল বিভাগে তিনি খালাস পান।
দীর্ঘ সময় বিএনপি ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে আমান উল্লাহ আমান দলীয় আন্দোলন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্বও পালন করেছেন। বিশেষ করে কেরানীগঞ্জকেন্দ্রিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক তৎপরতার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে তার শক্ত রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে।
রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবরণের মুখোমুখি হলেও বিএনপির রাজনীতি থেকে সরে যাননি আমান। দলীয় কর্মসূচি ও আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে বিএনপির পুরনো ও পরীক্ষিত নেতাদের একজন হিসেবে তার অবস্থান তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘ পথচলার স্বীকৃতি
রুহুল কবির রিজভী ও আমান উল্লাহ আমানের রাজনৈতিক জীবন ভিন্ন পথ ধরে এগোলেও তাদের মধ্যে একটি জায়গায় মিল রয়েছে—দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা এবং দলের কঠিন সময়ে সক্রিয় থাকা। ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে এসে দুজনই জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছেন।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার নতুন একটি অধ্যায় শুরু হলো। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে তারা তাদের অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে ভূমিকা রাখবেন—এমন প্রত্যাশা জানিয়েছে বিএনপি।
দলের রাজনীতিতে তাদের দীর্ঘদিনের অবদান ও ত্যাগ-তিতিক্ষার স্বীকৃতি হিসেবে স্থায়ী কমিটিতে এই অন্তর্ভুক্তিকে দেখছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। ছাত্ররাজনীতির রাজপথ থেকে জাতীয় নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে পৌঁছানো রিজভী ও আমানের এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা নতুন প্রজন্মের কাছে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।