ঢাকা, রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০১:৪৯:২২ AM

জবিউল্লাহ ও ডোনারকে ঘিরে কৌতূহল

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
15-08-2026 07:53:57 PM
জবিউল্লাহ ও  ডোনারকে ঘিরে কৌতূহল

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির শূন্য পদ পূরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দলের ভেতরে আলোচনা চলছিল। এর মধ্যে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চার নেতাকে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। নতুন চার সদস্যের মধ্যে রুহুল কবির রিজভী ও আমানুল্লাহ আমান বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। ছাত্ররাজনীতিতেও রয়েছে তাদের বর্ণাঢ্য অতীত।

তবে স্থায়ী কমিটিতে জায়গা পাওয়া সাবেক সচিব মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ এবং ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারকে নিয়ে দলের বাইরে-ভেতরে কিছুটা কৌতূহল তৈরি হয়েছে। মূলধারার মাঠের রাজনীতিতে তাদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম দৃশ্যমান হলেও বিএনপির সাংগঠনিক ও নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডে তারা দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রশাসন, পেশাজীবী সংগঠন ও নির্বাচন পরিচালনায় তাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটিতে নতুন চারজন

বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি ১৯ সদস্যের। নতুন চারজনকে অন্তর্ভুক্ত করার আগে কমিটিতে ১৩ জন সদস্য ছিলেন। তারা হলেন—তারেক রহমান, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

এর মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার গত ১২ জুলাই মারা যান। নতুন চারজনকে যুক্ত করার ফলে বর্তমানে কমিটির সদস্যসংখ্যা ১৭ জনে দাঁড়িয়েছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলে দলীয় পদ ছাড়তে হবে—এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে স্থায়ী কমিটিতে আরও একটি পদ শূন্য হতে পারে। ফলে ১৯ সদস্যের কমিটির বাকি শূন্য পদগুলোও পর্যায়ক্রমে পূরণের সুযোগ তৈরি হবে।

কে এই মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ?

সাবেক সচিব মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ প্রশাসনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে তিনি পূর্ণমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।

ইসমাইল জবিউল্লাহর গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চরকাদিরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মোক্তার বাড়ি। দীর্ঘ প্রশাসনিক জীবনে তিনি সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৫ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন তিনি। এর আগে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

অবসরের পর বিএনপির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন তিনি। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর দলের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গঠিত বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতেও তাকে প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিএনপির বৈঠকেও দলের প্রতিনিধি হিসেবে ইসমাইল জবিউল্লাহকে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। একই বছর বিএনপির প্রতিনিধি হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব এশিয়ান পলিটিক্যাল পার্টিজের (আইসিএপিপি) স্থায়ী কমিটির সদস্যও মনোনীত হন তিনি।

প্রশাসনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, নীতিনির্ধারণী বিষয়ে দক্ষতা এবং বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার কারণে এবার দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে জায়গা পেয়েছেন সাবেক এই আমলা।

কে এই অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার?

অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার চিকিৎসক, ক্যানসার বিশেষজ্ঞ এবং পেশাজীবী সংগঠনের নেতা হিসেবে পরিচিত। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক প্রকল্প পরিচালক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে তিনি সংগঠনটির প্রধান উপদেষ্টা। একই সঙ্গে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

পেশাগত পরিচয়ের পাশাপাশি বিএনপির রাজনীতিতেও ডা. ডোনারের দীর্ঘ সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতেও তার নাম ছিল।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবেও মনোনীত হয়েছেন ডা. ডোনার। গত ২৯ জুন অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের বার্ষিক অধিবেশনে ‘বিশিষ্ট নাগরিক’ হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাকে সিন্ডিকেট সদস্য নির্বাচিত করা হয়।

মাঠের রাজনীতির বাইরে ভিন্ন অভিজ্ঞতার দুই নেতা

বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি ঐতিহ্যগতভাবে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় এবং মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতাদের নিয়ে গঠিত হয়ে আসছে। সেই বিবেচনায় ইসমাইল জবিউল্লাহ ও ফরহাদ হালিম ডোনারের অন্তর্ভুক্তি কিছুটা ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।

ইসমাইল জবিউল্লাহর শক্তির জায়গা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে ধারণা এবং নীতিনির্ধারণী কাজে সম্পৃক্ততা। অন্যদিকে ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারের রয়েছে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, পেশাজীবী সংগঠনে নেতৃত্ব এবং বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়তার অভিজ্ঞতা।

দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দায়িত্ব পালন, নির্বাচন পরিচালনা ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে এই দুই নেতাকে স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির পেছনে তাদের নিজ নিজ পেশাগত দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে রুহুল কবির রিজভী ও আমানুল্লাহ আমানের অন্তর্ভুক্তি বিএনপির দীর্ঘদিনের মাঠের রাজনীতি ও ছাত্ররাজনীতির ধারাবাহিকতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে নতুন চার সদস্যের মাধ্যমে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে একদিকে যেমন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্ব বাড়ল, অন্যদিকে প্রশাসন, চিকিৎসা ও পেশাজীবী অঙ্গনের অভিজ্ঞতাও যুক্ত হলো।