ঢাকা, শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ১১:০২:৩০ PM

জিপিএস প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
21-08-2026 02:34:14 PM
জিপিএস প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

সড়ক দুর্ঘটনা কমানো, যানবাহনের বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ এবং গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্যে গত ১ আগস্ট থেকে গণপরিবহনে জিপিএস বা ভেহিকল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তবে উদ্যোগটি কার্যকর হওয়ার শুরুতেই উঠেছে তথ্যের নিরাপত্তা, অতিরিক্ত ব্যয়, প্রস্তুতির ঘাটতি ও জাল সনদের মতো গুরুতর অভিযোগ।

বিআরটিএর অনুমোদিত ২৭টি ভিটিএস প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ১১টি বিদেশি সার্ভার ব্যবহার করছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সার্ভার বা আইপি ঠিকানার অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, ভারত, লিথুয়ানিয়া ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে পাওয়া গেছে। অথচ বিটিআরসির ভিটিএস লাইসেন্সিং নীতিমালার ৫.০৫ ধারায় লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিকভাবে কোনো ভয়েস বা ডেটা ট্রাফিক বহন বা পাঠানোর ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

ফলে দেশের বিপুলসংখ্যক যানবাহনের রিয়েল-টাইম অবস্থান, চলাচলের ইতিহাস, রুট ও সময়সংক্রান্ত তথ্য বিদেশি অবকাঠামোর মাধ্যমে সংরক্ষিত বা প্রক্রিয়াজাত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ডেটা থেকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত যাতায়াত, বাসস্থান, কর্মস্থল ও চলাচলের ধরন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। ডেটা ফাঁস বা অপব্যবহার হলে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, লক্ষ্যভিত্তিক অপরাধ এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চলাচল পর্যবেক্ষণের মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিটিআরসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও কয়েকটি ভিটিএস প্রতিষ্ঠানের বিদেশি সার্ভার ব্যবহারের বিষয়টি নজরে আসার কথা জানিয়েছেন। তবে কেন এসব প্রতিষ্ঠান নীতিমালা লঙ্ঘনের পরও লাইসেন্স পেয়েছে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

ডিভাইসের দামে অসঙ্গতি

জিপিএস ডিভাইসের দাম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাজারে সাধারণ ৪জি ভেহিকল ট্র্যাকার প্রায় ৪০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে পাওয়া গেলেও বিআরটিএ অনুমোদিত ভেন্ডরদের কাছ থেকে একই ধরনের ডিভাইস কিনতে পরিবহনমালিকদের ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে মাসে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা অথবা বছরে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত সার্ভিস চার্জ নেওয়া হচ্ছে।

দেশে নিবন্ধিত বাণিজ্যিক যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ ধরে গড়ে ৪ হাজার টাকা মূল্যে ডিভাইস বসালে পরিবহনমালিকদের মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। বছরে গড়ে ৩ হাজার ৫০০ টাকা সার্ভিস চার্জ ধরলে আরও প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। অর্থাৎ শুধু ডিভাইস ও এক বছরের সার্ভিস বাবদ সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা।

প্রস্তুতি ছাড়াই বাধ্যতামূলক কার্যক্রম

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে বিআরটিএর নিজস্ব প্রস্তুতি নিয়ে। সার্কেল অফিসগুলোতে দেওয়া ভিটিএস প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ‘টেস্ট এপিআই কানেক্ট’ উল্লেখ থাকলেও কোন প্রতিষ্ঠান থেকে কীভাবে তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হবে—তার সুস্পষ্ট অবকাঠামো এখনো দৃশ্যমান নয়। বিআরটিএর নিজস্ব সার্ভার ব্যবস্থাপনা ও ডেটা নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত জনবলের ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে।

জিপিএস প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও কারিগরি রোডম্যাপ তৈরির জন্য গত জুনে ২৩ লাখ টাকায় ‘জিও প্ল্যানিং ফর অ্যাডভান্সড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড’কে (জি-প্যাড) পরামর্শক নিয়োগ দেয় বিআরটিএ। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অভিজ্ঞতা ড্রোন সার্ভে, জিআইএস ম্যাপিং ও নগর পরিকল্পনায়। তবে বৃহৎ পরিসরে লাইভ জিপিএস ট্র্যাকিং, এপিআই নিরাপত্তা বা ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট অবকাঠামো তৈরির পূর্বঅভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে খসড়া সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং অক্টোবরের মধ্যে পুরো পরামর্শক কার্যক্রম শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

জাল সনদে ফিটনেস নবায়নের অভিযোগ

কার্যক্রম শুরুর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই জাল জিপিএস সনদ ব্যবহারের অভিযোগও সামনে এসেছে। মিরপুর বিআরটিএ অফিসে একটি ভিটিএস প্রতিষ্ঠানের নামে এমন সনদ জমা দিয়ে দুটি বাসের ফিটনেস নবায়নের ঘটনা অনুসন্ধানে ধরা পড়ে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, তারা তখনো কোনো সনদ ইস্যুই করেনি।

বিআরটিএর কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, ডিজিটালভাবে সনদ যাচাইয়ের ব্যবস্থা না থাকায় জালিয়াতির সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে শুধু জিপিএস ডিভাইস বসানো নয়, সনদ যাচাই ও তথ্য আদান-প্রদানের পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ও নিরাপদ করা জরুরি।

আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো, অনেক মালিক শুধু ফিটনেস নবায়নের জন্য এক মাসের সার্ভিস প্যাকেজ নিচ্ছেন। পরবর্তী মাসে সার্ভিস বন্ধ হয়ে গেলে বিআরটিএর কাছে ওই গাড়ির ধারাবাহিক অবস্থান বা জিপিএস সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকছে না। এতে বাধ্যতামূলক জিপিএস ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা কি হবে?

প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্পে বিআরটিএর অতীত অভিজ্ঞতাও আশাব্যঞ্জক নয়। ২০১২ সালে গাড়ি চুরি প্রতিরোধ ও রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিংয়ের উদ্দেশ্যে ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি ব্যবস্থা চালু করা হয়। এতে গাড়িপ্রতি কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২১ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রায় ১৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে সিসিটিভি ও ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়। ১৪৭টি স্থানে ক্যামেরা বসানো হলেও রক্ষণাবেক্ষণ ও কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে সংযোগের সমস্যায় এর বড় অংশ অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জিপিএস ট্র্যাকিং নিঃসন্দেহে সড়ক নিরাপত্তা বাড়াতে কার্যকর প্রযুক্তি হতে পারে। কিন্তু তথ্যের মালিকানা, সার্ভারের অবস্থান, ডেটা এনক্রিপশন, অ্যাকসেস কন্ট্রোল, অডিট লগ, সাইবার নিরাপত্তা, ব্যাকআপ ও দুর্যোগকালীন পুনরুদ্ধার—সবকিছুর জন্য স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিভাইসের দাম ও সার্ভিস চার্জে স্বচ্ছতা, ভেন্ডর নির্বাচনের যৌক্তিকতা এবং জাল সনদ ঠেকাতে তাৎক্ষণিক ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

নইলে সড়ক নিরাপত্তা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া জিপিএস প্রকল্পটি একদিকে পরিবহনমালিকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে, অন্যদিকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ লোকেশন ডেটার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলবে। অতীতের ব্যর্থ প্রকল্পগুলোর পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে তাই বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।