ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৫:১৮:৩৫ PM

সফটওয়্যার বদলের আড়ালে ৫০ কোটি টাকা লুট

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
17-08-2026 03:58:03 PM
সফটওয়্যার বদলের আড়ালে ৫০ কোটি টাকা লুট

সফটওয়্যার ও সার্ভারের কারিগরি ব্যবস্থায় জালিয়াতির মাধ্যমে রংপুর সিটি করপোরেশনের (রসিক) রাজস্ব খাত থেকে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সফটওয়্যারের মূল কোড পরিবর্তন, ভুয়া ও অস্তিত্বহীন ‘ভূতুড়ে’ হোল্ডিং অ্যাকাউন্ট তৈরি, প্রকৃত হোল্ডিংয়ের কর কম দেখানো, পুরোনো বকেয়া গোপন এবং ব্যাংকের সিল জালিয়াতির মতো নানা কৌশলে এ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এসব অনিয়মের সঙ্গে সাবেক মেয়র ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফার ঘনিষ্ঠ একটি চক্র জড়িত ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে পূর্ণ সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৫ সালের পর জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে রসিকের কর ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সফটওয়্যার চালু করা হয়। সফটওয়্যারটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গোপন পাসওয়ার্ড মেয়র, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও রাজস্ব কর্মকর্তার কাছে থাকার কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ২০১৯ সালে কোনো প্রশাসনিক বা কারিগরি অনুমোদন ছাড়াই সার্ভারের মূল কোড পরিবর্তন করা হয়। এতে সফটওয়্যারটির নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মেয়র ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ একটি চক্রের হাতে চলে যায়।

এ ঘটনায় রসিকের কর আদায় শাখার কম্পিউটার অপারেটর এবং জাতীয় ছাত্রসমাজের জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক আরিফুল ইসলামের নাম এসেছে। তিনি সাবেক মেয়রের আস্থাভাজন ছিলেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, আরিফুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা সফটওয়্যারের কারিগরি নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে রাজস্ব আদায়ের তথ্য পরিবর্তন ও গোপন করতেন। একই সঙ্গে সার্ভার থেকে দৈনন্দিন কার্যক্রমের ডিজিটাল লগ বা ট্র্যাকিং হিস্ট্রি মুছে ফেলার অভিযোগও রয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে রসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব রাকিব হাসান চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিবকে একটি চিঠি দেন। ওই চিঠিতে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে বিপুল অর্থের অনিয়মের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। চিঠির সূত্র ধরে অনুসন্ধানে সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আদায়ের বিভিন্ন অসংগতির তথ্য পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সরকারি তহবিলের ঘাটতি আড়াল করতে সফটওয়্যার থেকে কিছু প্রকৃত ও তুলনামূলক কম করের পুরোনো অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলা হতো। পরে ওই জায়গায় নামে-বেনামে নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি করে সেখানে বড় অঙ্কের বকেয়া কর দেখানো হতো। এতে হিসাবের খাতায় রাজস্ব ঘাটতি আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণে রসিকের মোট ৫৯ হাজার ৬৭০টি হোল্ডিংয়ের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার হোল্ডিংয়ের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর মধ্যে ১৭টি হোল্ডিংয়ের কাল্পনিক অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে। এসব অ্যাকাউন্টের বিপরীতে মোট ১ কোটি ৭১ লাখ ৬৫ হাজার ২৯১ টাকা বকেয়া দেখানো হয়েছে।

এর মধ্যে ‘২৮-১৪০-০৯৮০-০০’ নম্বর হোল্ডিংটি ‘আকরাম’ নামে নিবন্ধিত এবং এতে ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ২৯২ টাকা বকেয়া দেখানো হয়েছে। আবার ৮৩৬ নম্বর সিরিয়ালে নামের পরিবর্তে শুধু ইংরেজি অক্ষর ‘এস’ ব্যবহার করে আলমনগর ঠিকানায় ৪৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা বকেয়া দেখানো হয়েছে। ‘২৭-১২২-০১৯৯-০১’ নম্বর হোল্ডিংয়ে ‘গ্রামীণ টাওয়ার’ নামে ৩৭ লাখ ২০ হাজার ৭৫০ টাকা বকেয়া দেখানো হয়। সরেজমিনে সংশ্লিষ্ট এলাকায় এসব হোল্ডিংয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া জিএল রায় রোডের ‘এসোড’ কার্যালয়ের করের ক্ষেত্রেও অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে বকেয়া থাকা ওই প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা পরবর্তী সময়ে ‘ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট’-এর কাছে বিক্রি হয়। অভিযোগ রয়েছে, পুরোনো বকেয়া গোপন করে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাত্র ৭৮ হাজার ৮১২ টাকার বিল দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি ধরা পড়লে সিটি করপোরেশন প্রকৃত বকেয়া ৬ লাখ ৯৭ হাজার ৬৫০ টাকা নির্ধারণ করে নতুন বিল দেয় এবং তা পরিশোধ করা হয়।

তহসিন উদ্দিন রোডের সারওয়ার হোসেন ও গোলাম নাসিরের একটি হোল্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কর হিসেবে মাত্র ৬ হাজার ৩৮৬ টাকা দেখিয়ে চূড়ান্ত রসিদ দেওয়া হলেও অভ্যন্তরীণ নথিতে প্রায় ২৮ হাজার ১৭৩ টাকা বকেয়া থাকার তথ্য পাওয়া যায়। বাড়ির মালিক গোলাম নাসিরের অভিযোগ, সহকারী কর আদায়কারী মো. আয়েজউদ্দিনের মাধ্যমে ওই বিল প্রস্তুত করা হয়েছিল। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর আয়েজউদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে সাবেক মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা বলেন, ‘এ বিষয়গুলো অনেক পুরোনো। ওই সময় যারা কর শাখায় অর্থ আদায় করেছেন, তারাই ভালো বলতে পারবেন।’ এসব বিষয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

অভিযোগগুলোর পূর্ণ সত্যতা নির্ধারণে সফটওয়্যারের সার্ভার লগ, কোড পরিবর্তনের নথি, হোল্ডিং রেজিস্টার, ব্যাংক হিসাব ও রাজস্ব আদায়ের অর্থনৈতিক লেনদেন স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থের পরিমাণ এবং দায়ীদের ভূমিকা নির্ধারণ করা জরুরি।