ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০২:৩৬:১২ AM

মন্ত্রণালয়ের দখলে রাজউক-গণপূর্তের ৭ গাড়ি

ষ্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
24-08-2026 11:48:16 AM
মন্ত্রণালয়ের দখলে রাজউক-গণপূর্তের ৭ গাড়ি

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাতটি দামি গাড়ি ব্যবহার করছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব ও তাঁদের দপ্তরের কর্মকর্তারা। এসব গাড়ির মধ্যে রয়েছে মিতসুবিশি পাজেরো স্পোর্ট, মিতসুবিশি আউটল্যান্ডারসহ বিভিন্ন এসইউভি। সরকারি সংস্থার গাড়ি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য দেওয়ায় এগুলোর জ্বালানি, চালক, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও বহন করছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকার গঠনের পরপরই রাজউক ও গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে বাছাই করে এসব গাড়ি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা ব্যবহার শুরু করেন। এমনকি সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করার ঘোষণা দেওয়া প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরের জন্যও রাজউক থেকে গাড়ি নেওয়া হয়েছে। ফলে সরকারি সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহারের পরিবর্তে এক সংস্থার সম্পদ অন্য দপ্তরের কাজে ব্যবহারের মাধ্যমে বাড়ছে সরকারি ব্যয়।

প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরে তিন দামি গাড়ি

গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুরের দপ্তরের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে রাজউকের মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার জিপ। ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৪-৩৩৩৫ নম্বরের গাড়িটির চালক মো. ইয়াসিন মল্লিক।

এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (উপসচিব) মোশারফ হোসেন ব্যবহার করছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি ধূসর রঙের হুন্দাই এসইউভি। ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৬-২২৫৯ নম্বরের গাড়িটির চালক বাবলু। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গাড়িটি আগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সমন্বয়) ব্যবহার করতেন।

অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব হুমায়ুন রশিদ ব্যবহার করছেন নগর গণপূর্ত বিভাগের মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার জিপ। গাড়িটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৮-৭২৩৫।

এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব মোশারফ হোসেন বলেন, ‘কে কোন গাড়ি ব্যবহার করবেন, তা মন্ত্রণালয়ের সচিব ঠিক করে দেন। এখানে আমাদের ব্যক্তিগত কিছু নেই।’

সহকারী একান্ত সচিব হুমায়ুন রশিদ বলেন, ‘এটা মন্ত্রণালয়ের গাড়ি। আমি দাপ্তরিক কাজের জন্য ব্যবহার করছি।’

মন্ত্রীর দপ্তরেও পাজেরো স্পোর্ট

রাজউকের গাড়ির পাশাপাশি নগর গণপূর্ত বিভাগের মিতসুবিশি পাজেরো স্পোর্ট ও আউটল্যান্ডার জিপও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ব্যবহারে রয়েছে।

ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-৯৩৮০ নম্বরের পাজেরো স্পোর্টটি দেওয়া হয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রীর একান্ত সচিব (উপসচিব) মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মৌখিক নির্দেশে গাড়িটি তাঁকে দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ওই কর্মকর্তা আগে গাড়ি কেনার জন্য সরকারের কাছ থেকে সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা পেয়েছিলেন বলেও জানা গেছে।

মুরাদ বলেন, ‘আমি আগেও গাড়ি কেনার জন্য আর্থিক সুবিধা পেয়েছিলাম। তবে গণপূর্তের পাজেরো স্পোর্ট শুধু অফিসে আসা-যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি আমার ২৪ ঘণ্টার জন্য বরাদ্দ নয়।’

এ ছাড়া ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৮-৪২৯৭ নম্বরের আরেকটি পাজেরো স্পোর্ট ব্যবহার করছেন মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব মো. মোয়াজ্জেম হোসেন।

তিনি বলেন, ‘পূর্তের গাড়ি ব্যবহার করা যাবে কি না, এই নিয়ম সম্পর্কে আমার জানা নেই। এই গাড়িটি সাধারণত মন্ত্রী মহোদয় ব্যবহার করেন। আমি তাঁর সঙ্গে দপ্তরে আসি, আবার তাঁর সঙ্গে বের হয়ে যাই।’

সচিবের দপ্তরেও সংস্থার গাড়ি

গণপূর্ত সচিবের একান্ত সচিব (উপসচিব) বশির আহম্মদ ব্যবহার করছেন ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-২৮৮৩ নম্বরের ডিজেলচালিত পাজেরো স্পোর্ট। গাড়িটির চালক মো. শহিদুল ইসলাম।

অন্যদিকে ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-১৯৭৯ নম্বরের মিতসুবিশি আউটল্যান্ডারটি রয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেনের ব্যবহারের জন্য।

আলমগীর হোসেন বলেন, ‘দাপ্তরিক বিভিন্ন কাজে আমরা গাড়ি ব্যবহার করে থাকি। যেমন কোনো জায়গায় মিটিংয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি ব্যবহার করতে হয়।’

বাড়ছে সরকারি ব্যয়

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত এসব গাড়ির চালক, জ্বালানি, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বহন করছে রাজউক ও গণপূর্ত অধিদপ্তর। ফলে যে সংস্থার নিজস্ব কাজের জন্য গাড়িগুলো থাকার কথা, সেখান থেকে অন্য দপ্তরের কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য গাড়ি দেওয়ায় সংস্থাগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।

আরও প্রশ্ন উঠেছে, যেসব কর্মকর্তা গাড়ি কেনার জন্য সরকারের কাছ থেকে সুদমুক্ত ঋণসহ বিভিন্ন সুবিধা পেয়েছেন, তাঁরা কীভাবে আবার সরকারি সংস্থা বা প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করছেন। বিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সুবিধা গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সরকারি গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ সীমিত থাকার কথা।

জ্বালানি ভাতার বিধান

১৯৯১ সালে জারি করা এক আদেশে উপ-রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সমপর্যায়ের ব্যক্তিদের গাড়ির জ্বালানি ভাতা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। নির্দিষ্ট ভাতার পরিবর্তে দৈনিক ২০ লিটার জ্বালানির মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ তাঁদের বেতনের সঙ্গে যুক্ত করার বিধান করা হয়।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এক পরিপত্রের মাধ্যমে জ্বালানি খাতে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে বরাদ্দের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ ব্যয় এবং বাকি ৩০ শতাংশ সাশ্রয়ের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বরাদ্দের ৭০ শতাংশ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বেতনের সঙ্গে যুক্ত করার বিধান রাখা হয়েছে।

এ অবস্থায় অধীনস্থ সংস্থার গাড়ি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহারে দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং একই গাড়ির পেছনে একাধিক সরকারি সুবিধা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।