ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০২:৩৭:৫৩ AM

প্রকৌশলী কায়সার কবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ

ষ্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
24-08-2026 12:07:29 PM
প্রকৌশলী কায়সার কবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ

জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রশাসনিক সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি হলেও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ এখনো সামনে আসছে। এরই মধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগকে ঘিরে টেন্ডার, বদলি, পদায়ন ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কায়সার কবির।

তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে টেন্ডার পদ্ধতি পরিবর্তন, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া, কমিশনভিত্তিক আর্থিক লেনদেন, টেন্ডার ও পোস্টিং সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন নিশ্চিত করতে অর্থ লেনদেন ও অধস্তন কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কায়সার কবির দাবি করেছেন, অভিযোগগুলো ‘মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’। টেন্ডারের আইডি যাচাই না করে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না বলেও তিনি জানান।

টেন্ডার পদ্ধতি পরিবর্তনের অভিযোগ

কায়সার কবিরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু কাজে লিমিটেড টেন্ডার মেথড (এলটিএম) অনুসরণের কথা থাকলেও ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে তিনি ওপেন টেন্ডার মেথড (ওটিএম) ব্যবহার করে দরপত্র আহ্বান করেন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ওটিএম পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক হলেও সংশ্লিষ্ট দরপত্রগুলো এমনভাবে পরিচালনা করা হয়েছে, যাতে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদার সুবিধা পান। এতে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্তত ৬০টির বেশি দরপত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এর মধ্যে ১০৬০৬৮৯, ১০৭০৫৪৬, ১০৬৬৫৯৪, ১০৬৭৭২৪, ১০৬৬৬০২, ১০৭০৫৪৩, ১০৭০৫৪৫, ১০৬৭৭২৭, ১০৬৭৭২৬, ১০৭০৫৪০, ১০৭০৫৪৮, ১০৫৮০৭৮, ১০৪৫৫৪৩, ১০৪৫৫৫০, ১০৫৮৪৯৯, ১০৫৮৫০০, ১০৬০০৮৪, ১০৪৫৫১৫সহ আরও বেশ কিছু টেন্ডার রয়েছে।

কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কমিশনভিত্তিক আর্থিক লেনদেনের একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। কাজের ধরন ও মূল্য অনুযায়ী কমিশনের পরিমাণ কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। এসব টেন্ডারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।

ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা। রাজধানীর সরকারি ভবন, সরকারি বাসভবন, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ এ বিভাগের আওতায় পরিচালিত হয়। প্রতি বছর এখানে বিপুল অর্থের কাজ হওয়ায় নির্বাহী প্রকৌশলীর হাতে টেন্ডার, কাজের অনুমোদন ও ঠিকাদার নির্বাচনসহ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা থাকে।

অধস্তনদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, কায়সার কবির সরাসরি সব কার্যক্রম পরিচালনা না করে তাঁর আস্থাভাজন কিছু অধস্তন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে বিভাগের বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন।

বদলি, দায়িত্ব বণ্টন, কাজ অনুমোদন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা কর্মকর্তাদের বদলি বা প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছে—এমন অভিযোগও করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। পোস্টিং, বদলি ও বার্ষিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব থাকায় অনেক কর্মকর্তা প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না বলেও দাবি করা হয়েছে।

পোস্টিং নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

কায়সার কবিরের কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্ব পালন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সাভার সার্কেলে সহকারী প্রকৌশলী থাকাকালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কথা সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী সময়ে জামালপুরে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী থাকাকালে স্থানীয় রাজনৈতিক ও ঠিকাদারি মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও ওঠে।

এ ছাড়া একাধিক নির্বাহী প্রকৌশলীর ই-জিপি ব্যবস্থার পাসওয়ার্ড নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগটি সত্য হলে সরকারি ই-প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়।

ঢাকায় আজিমপুর, গুলশানসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সাব-ডিভিশনে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর পোস্টিং নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। পরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে চলতি দায়িত্ব পাওয়ার পর ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ

কায়সার কবিরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে বদলি ও পদায়ন প্রভাবিত করার অভিযোগও রয়েছে। সাবেক মন্ত্রী র. আ. ম. উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ও তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অর্থায়ন এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমেও তিনি প্রশাসনিক সুবিধা নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ ও জীবনযাপন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাজধানীতে বসবাস, গাড়ি ব্যবহার ও পারিবারিক ব্যয়ের সঙ্গে তাঁর ঘোষিত আয়ের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জুলাই আন্দোলন নিয়েও গুরুতর অভিযোগ

কায়সার কবিরের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর দমন-পীড়ন বা হত্যাকাণ্ডে অর্থায়নের গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ বা আইনগত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রধান বিষয়গুলো হলো—টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া, কমিশন বাণিজ্য, পোস্টিং-বদলিতে প্রভাব, রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার এবং সম্পদ বৃদ্ধির প্রশ্ন। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট টেন্ডার নথি, ই-জিপি তথ্য, আর্থিক লেনদেন এবং সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।