ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০২:১৮:৫৩ PM

রিজভীকে ঘিরে বিএনপিতে নতুন প্রত্যাশা

মান্নান মারুফ
25-08-2026 12:50:38 PM
রিজভীকে ঘিরে বিএনপিতে নতুন প্রত্যাশা

মিষ্টভাষী, ধৈর্যশীল ও দায়িত্ববান নেতা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় রুহুল কবির রিজভী। রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সক্রিয়তার কারণে তৃণমূলের কাছে তিনি পরিচিত ও আস্থাভাজন মুখ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন। সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা।

তাদের ভাষ্য, দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও রিজভীকে তারা মাঠে পেয়েছেন। দলীয় কর্মসূচি, আন্দোলন-সংগ্রাম কিংবা সাংগঠনিক সংকট—বিভিন্ন সময়ে তার সক্রিয় উপস্থিতি তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে আস্থার জায়গা তৈরি করেছে। ফলে একজন ‘কর্মীবান্ধব’ ও ‘মাঠের নেতা’ হিসেবে রুহুল কবির রিজভীর নতুন দায়িত্ব গ্রহণকে স্বাগত জানাচ্ছেন দলের অনেক নেতা-কর্মী।

বিএনপির পক্ষ থেকে ২০ আগস্ট রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার ঘোষণা দেওয়া হয়। দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭(খ)৬ ধারা অনুযায়ী জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে এবং এ মনোনয়ন তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে রিজভীকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়।

দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রিজভীর নতুন দায়িত্বকে তারা শুধু একটি সাংগঠনিক পদায়ন হিসেবে দেখছেন না; বরং দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেও দেখছেন। তাদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে দলীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকার কারণে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত ও তৃণমূলের বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় তৈরিতে রিজভী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।

রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির এক কর্মী মাসুম বলেন, “রুহুল কবির রিজভী মাঠের নেতা। মাঠে থাকা নেতাকেই মাঠের কর্মীদের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।” তার দাবি, দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময় রিজভীকে নিয়মিত নেতা-কর্মীদের পাশে পাওয়া গেছে। ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের পাশাপাশি দলীয় সংকটেও তিনি কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন বলে মনে করেন এই কর্মী।

মাসুমের ভাষ্য, গত ১৬ বছরে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী নানা ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। এ সময়ে রিজভীকে দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় দেখা গেছে। তার ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়ার খবরে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

বিএনপির সাবেক ছাত্রনেতা ও বরিশাল বিএম কলেজের সাবেক ভিপি এমাম জাফর বলেন, দলের নেতৃত্ব সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার মতে, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও দলের প্রতি নিবেদিত একজন নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এমাম জাফরের মতে, রাজনৈতিক অঙ্গনে রুহুল কবির রিজভী নিজেকে একজন পরীক্ষিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। একই সঙ্গে দলের প্রতি আনুগত্য এবং নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তার দায়িত্ব পাওয়ার মধ্য দিয়ে একদিকে একজন অভিজ্ঞ ও কর্মীবান্ধব নেতার মূল্যায়ন হয়েছে, অন্যদিকে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাও তাদের পছন্দের নেতাকে সাংগঠনিকভাবে আরও কাছে পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন বলে তিনি মনে করেন।

রংপুরের বিএনপি কর্মী আমিনুল ইসলাম বলেন, রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত দল ও কর্মীদের জন্য ইতিবাচক। তার মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এজন্য তিনি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

রাজশাহীর বিএনপি কর্মী শওকত হোসেন বলেন, বিএনপিতে অনেক অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত নেতা রয়েছেন। তবে রিজভীর মতো সব সময় কর্মীদের পাশে থাকা নেতার সংখ্যা খুব বেশি নয়। তার ভাষ্য, রিজভী দীর্ঘ সময় ধরে দলীয় কর্মকাণ্ড ও নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন। ফলে সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে তৃণমূলের অনেকেই মনে করেন।

চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে রিজভীর দায়িত্ব গ্রহণকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের আনন্দ মিছিল ও শুভেচ্ছা কর্মসূচির খবরও এসেছে। গাইবান্ধা ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাকে অভিনন্দন জানিয়ে আনন্দ মিছিল করেছেন।

তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মতে, একজন মহাসচিব বা ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের জন্য সাংগঠনিক দক্ষতার পাশাপাশি মাঠের বাস্তবতা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা থাকা জরুরি। কর্মীদের কথা শোনা, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং দলীয় সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে সক্ষমতা—এসব গুণ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে রিজভীর মধ্যে এসব অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

নেতা-কর্মীদের ভাষ্য, রিজভীর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য তার মিষ্টভাষী আচরণ, ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতা। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দলীয় কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন এবং নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। ফলে তার নেতৃত্বে দল সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী হবে বলে তৃণমূলের অনেকেই আশাবাদী।

তবে নতুন দায়িত্বের সঙ্গে রিজভীর সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তৃণমূলের প্রত্যাশাকে সাংগঠনিক শক্তিতে রূপ দেওয়া, কেন্দ্র ও মাঠপর্যায়ের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নেতা-কর্মীদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর মধ্যে থাকবে। দায়িত্ব গ্রহণের পর রিজভী নিজেও দলীয় নেতা-কর্মীদের জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একজন নেতার জনপ্রিয়তা তখনই সাংগঠনিক শক্তিতে পরিণত হয়, যখন সেই জনপ্রিয়তাকে দলীয় শৃঙ্খলা, কার্যকর নেতৃত্ব ও কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করার কাজে ব্যবহার করা যায়। সে বিবেচনায় রিজভীর সামনে যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় দায়িত্বও।

সব মিলিয়ে রুহুল কবির রিজভীর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণকে ঘিরে বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের মাঠের অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়তা এবং কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি কেন্দ্র ও তৃণমূলের মধ্যে আরও কার্যকর সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পারবেন—এমন প্রত্যাশাই এখন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের।