ঢাকা, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬,
সময়: ০৬:০৮:৫৫ PM

কারাপ্রকোষ্ঠে যে ভাবে কাটছে মিন্নির জীবন

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
27-06-2026 04:30:40 PM
কারাপ্রকোষ্ঠে যে ভাবে কাটছে মিন্নির জীবন

২০১৯ সালের ২৬ জুন। বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার সেই হৃদয়বিদারক ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ঘটনার ভিডিও মুহূর্তেই দেশজুড়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দেয়। দেখতে দেখতে সেই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পূর্ণ হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে মামলাটি একাধিক নাটকীয় মোড় নিয়েছে। ঘটনার শুরুতে প্রধান সাক্ষী হিসেবে পরিচিত রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন। আলোচিত এই মামলার অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র মিন্নির বর্তমান জীবনযাপন নিয়েও মানুষের আগ্রহের শেষ নেই।

কারা সূত্রে জানা যায়, কাশিমপুর কারাগার থেকে স্থানান্তরের পর বর্তমানে মিন্নি বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। বাইরের আলোচিত ও বিতর্কিত পরিচয়ের বিপরীতে কারাগারের ভেতরে তার জীবন এখন অনেকটাই নীরব ও একাকী।

কারাগারের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, মিন্নি অধিকাংশ সময় নিজ কক্ষে নীরবে কাটান। অন্যান্য বন্দি কিংবা কারারক্ষীদের সঙ্গে তিনি খুব বেশি কথাবার্তা বলেন না। নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে রেখেছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, ধর্মীয় অনুশীলনের প্রতিও তার ঝোঁক বেড়েছে। নিয়মিত নামাজ আদায়, কোরআন তেলাওয়াত এবং ধর্মীয় অনুশাসন পালনের মধ্য দিয়েই দিনের একটি বড় অংশ অতিবাহিত করেন তিনি। কারাজীবনের কঠিন বাস্তবতায় ধর্মীয় চর্চাই তার মানসিক শক্তির অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে বলে কারা সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগই এখন বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে তার একমাত্র সংযোগ। বাবা-মা ও নিকটাত্মীয়রা সাক্ষাৎ করতে এলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। এছাড়া অন্য কারও সঙ্গে তার যোগাযোগের সুযোগ খুবই সীমিত।

কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মিন্নি কারাগারের নিয়মকানুন মেনে চলেন এবং তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ওঠেনি। একজন সাধারণ বন্দির মতোই তিনি কারা বিধি অনুসরণ করছেন।

রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ড ছিল দেশের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত অপরাধগুলোর একটি। ২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে একদল হামলাকারী ধারালো অস্ত্র দিয়ে রিফাত শরীফের ওপর হামলা চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরে তার মৃত্যু হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত মিন্নির স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টার দৃশ্য ভিডিওতে ধরা পড়ে এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার পর প্রথমদিকে মিন্নিকে ভুক্তভোগী এবং প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে তদন্তের এক পর্যায়ে পুলিশের অভিযোগে মামলার গতিপথ বদলে যায়। তদন্ত সংস্থা দাবি করে, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় মিন্নির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এরপর তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং মামলার অন্যতম আসামি হিসেবে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত মিন্নিসহ ছয়জন প্রাপ্তবয়স্ক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই সঙ্গে কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামির বিচার পৃথক কিশোর আদালতে পরিচালিত হয়। পরবর্তীতে মৃত্যুদণ্ডের রায় উচ্চ আদালতে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয় এবং মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া এখনও আইনি ধাপের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে।

অন্যদিকে, শুরু থেকেই মিন্নির পরিবার দাবি করে আসছে যে, তিনি নির্দোষ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাকে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে। মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে অভিযোগ করে বলেছেন, তার মেয়েকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে।

তার দাবি, ঘটনার সময় মিন্নি প্রকাশ্যেই তার স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তদন্তের একপর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় ক্ষমতাবানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তাকে আসামি করা হয়। তবে এসব অভিযোগ তদন্তকারী সংস্থা ও রাষ্ট্রপক্ষ গ্রহণ করেনি এবং আদালতও বিচারিক প্রক্রিয়ায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই রায় দিয়েছেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো মামলার বিচার শেষ হলেও উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকে। ফলে আলোচিত এই মামলার ভবিষ্যৎও উচ্চ আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করছে।

সাত বছর পেরিয়ে গেলেও রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ড এখনো দেশের অন্যতম আলোচিত মামলাগুলোর একটি। একদিকে একটি পরিবারের স্বজন হারানোর বেদনা, অন্যদিকে আরেকটি পরিবারের দাবি—তাদের মেয়েকে অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যেই মামলাটি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা এখনও অব্যাহত রয়েছে।

একসময় যে মিন্নিকে মানুষ দেখেছিল স্বামীকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা করতে, সেই তিনিই এখন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে দিন কাটাচ্ছেন। আলোচিত এই মামলার চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রিফাত হত্যাকাণ্ড এবং মিন্নিকে ঘিরে বিতর্কের অবসান হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। দেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এই মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি অধ্যায় হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।