পর্ব-৮
সকালের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকছিল। সেই আলো একসময় এই বাড়িতে নতুন দিনের শুরু ঘোষণা করত। আজও আলো এসেছে, কিন্তু ঘরের ভেতর তার কোনো উষ্ণতা নেই। নীরবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে রিফাত অনুভব করল, শোকেরও একটি শব্দ আছে—যা শোনা যায় না, কিন্তু প্রতিটি নিঃশ্বাসে অনুভব করা যায়।
আগের রাতে মায়ের পুরোনো টিনের বাক্স খুলে সে কিছু কাগজ, কয়েকটি সযত্নে ভাঁজ করা রসিদ, বাবার একটি বিবর্ণ ছবি আর একটি ছোট্ট খাতা পেয়েছিল।
খাতার প্রথম পাতায় মায়ের হাতের লেখা—
"আজও বাচ্চাদের মুখে হাসি দেখলাম। আল্লাহ, এই হাসিটুকু যেন কখনও কেড়ে নিও না।"
রিফাত বাকিটা পড়তে পারেনি।
চোখ ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল।
সকালে থানার একজন কর্মকর্তা ফোন করলেন।
— "রিফাত, তোমাকে থানায় আসতে হবে। তদন্তের কিছু বিষয়ে কথা বলতে চাই।"
রিফাত ধীরে বলল,
— "আচ্ছা, আসছি।"
ফোন রেখে সে দীর্ঘক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
যে দরজা দিয়ে মা প্রতিদিন বিদায় দিতেন, আজ সেই দরজা পেরিয়ে তাকে যেতে হচ্ছে এমন এক লড়াইয়ে, যেখানে তার সঙ্গে আর কেউ নেই।
থানার তদন্তকক্ষে বসে ছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা।
টেবিলের ওপর ফাইলের স্তূপ।
কয়েকটি ছবি, কিছু নোট, সাক্ষ্য, প্রতিবেদন।
তিনি শান্ত গলায় বললেন,
— "আমরা অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। কিছু তথ্য মিলছে, কিছু এখনও যাচাই করা হচ্ছে।"
রিফাত নীরবে শুনছিল।
— "কয়েকজন প্রতিবেশী বলেছেন, ঘটনার আগের সপ্তাহগুলোতে একজন অপরিচিত মানুষকে এলাকায় দেখা যেত।"
রিফাত মাথা নাড়ল।
— "মাও বলেছিলেন।"
কথাটা বলতে গিয়েই তার গলা ভারী হয়ে গেল।
তার মনে পড়ল, সেদিন যদি তারা বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিত!
তদন্ত কর্মকর্তা বললেন,
— "কখনও কখনও মানুষ অস্বাভাবিক আচরণকে গুরুত্ব দেয় না। পরে যখন বড় ঘটনা ঘটে, তখন সবাই ভাবতে থাকে—ইশ, যদি আগে সতর্ক হতাম।"
কথাগুলো রিফাতের বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধল।
তদন্ত এগোতে থাকল।
পুলিশ জানতে পারল, সন্দেহভাজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে অস্থির আচরণ করছিল বলে আশপাশের কিছু মানুষ জানিয়েছেন। কেউ বলেছিলেন, তিনি একা একা কথা বলতেন। কেউ বলেছিলেন, তার আচরণ হঠাৎ বদলে যেত। আবার অন্যরা বলেছিলেন, এসব নিয়ে কেউ তেমন গুরুত্ব দেয়নি।
তদন্ত কর্মকর্তা স্পষ্ট করলেন,
— "কারও মানসিক অসুস্থতা আছে কি না, সেটি চিকিৎসাগত বিষয়। আর কোনো অপরাধ ঘটলে, তার আইনি দায় তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হয়। আমরা সব দিকই যাচাই করছি।"
রিফাত চুপ করে শুনছিল।
তার মনে একটাই প্রশ্ন—
যদি সত্যিই কেউ সমস্যায় ভুগে থাকে, তবে সময়মতো চিকিৎসা বা সহায়তা কেন পায়নি?
আর যদি আগেই মানুষ সতর্ক হতো, তাহলে কি আজ তার পরিবার বেঁচে থাকত?
এই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই।
থানা থেকে বেরিয়ে রিফাত সাংবাদিকদের ভিড় দেখল।
মাইক্রোফোন বাড়িয়ে একজন প্রশ্ন করলেন,
— "আপনি কী বিচার চান?"
রিফাত কিছুক্ষণ চুপ রইল।
তারপর বলল,
— "আমি শুধু চাই, সত্যিটা সামনে আসুক। আর যেন কোনো পরিবার এমনভাবে শেষ না হয়ে যায়।"
তার কথায় উপস্থিত সবাই নীরব হয়ে গেল।
বাড়ি ফিরে সে মায়ের ডায়েরির পাতা খুলল।
এক জায়গায় লেখা—
"রিফাত খুব ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরে। তবু হাসে। আমি ওর হাসিটা বাঁচিয়ে রাখতে চাই।"
আরেক পাতায়—
"রিমি আজ নিজের টিউশনের টাকা দিয়ে আমার জন্য শাড়ি কিনেছে। আমি শাড়িটা ঈদে পরব।"
রিফাত আর পড়তে পারল না।
শাড়িটা এখনও আলমারিতে ভাঁজ করে রাখা।
যে ঈদের জন্য তুলে রাখা হয়েছিল, সেই ঈদ আর কোনোদিন আগের মতো আসবে না।
সন্ধ্যায় এলাকাবাসী একটি বৈঠকের আয়োজন করল।
সবাই একমত হলো—এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
রাতে পাহারার ব্যবস্থা।
অপরিচিত কাউকে দেখলে খোঁজ নেওয়া।
প্রয়োজনে দ্রুত প্রশাসনকে জানানো।
একজন প্রবীণ মানুষ উঠে বললেন,
— "আমরা অনেক সময় ভাবি, এটা আমার বিষয় নয়। কিন্তু একদিন সেই অবহেলাই পুরো একটি পরিবারকে ভেঙে দিতে পারে।"
কথাগুলো শুনে উপস্থিত অনেকেই মাথা নিচু করলেন।
রবিনের চোখে আবার জল চলে এল।
তিনি দাঁড়িয়ে বললেন,
— "শাহানা আপা আমাকে বলেছিলেন, একজন লোককে দেখে তাঁর অস্বস্তি হচ্ছিল। আমি যদি তখন গুরুত্ব দিতাম..."
তিনি আর কথা শেষ করতে পারলেন না।
রিফাত উঠে গিয়ে তাঁর কাঁধে হাত রাখল।
— "চাচা, নিজেকে দোষ দেবেন না। এখন আমাদের যা করার, তা হলো অন্য কোনো পরিবার যেন এমন কষ্ট না পায়।"
রাত গভীর।
রিফাত একা বসে আছে উঠোনে।
এই উঠোনেই একসময় মুনা লাফিয়ে খেলত।
রিমি ছাত্র পড়াত।
নীলা বই হাতে হাঁটত।
মা সেলাই করতে করতে মাঝেমধ্যে তাকিয়ে হাসতেন।
আজ সবই স্মৃতি।
হঠাৎ মনে হলো, মানুষ আসলে দু'বার মারা যায়।
একবার যখন তার জীবন শেষ হয়।
আরেকবার যখন তার স্মৃতিকে কেউ আর মনে রাখে না।
রিফাত ধীরে বলল,
— "আমি তোমাদের ভুলতে দেব না।"
পরদিন তদন্ত কর্মকর্তা আবার এলেন।
তিনি জানালেন, তদন্তের বিভিন্ন ধাপ এগোচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
তিনি আরও বললেন,
— "বিচার একটি দীর্ঘ পথ। ধৈর্য লাগবে।"
রিফাত মাথা নাড়ল।
আগে হলে হয়তো সে ভেঙে পড়ত।
কিন্তু এখন তার ভেতরে অন্যরকম এক শক্তি জন্ম নিচ্ছে।
সে বুঝতে পারছে, শুধু কান্নায় জীবন থেমে থাকে না।
যারা চলে গেছে, তাদের স্মৃতির প্রতি সবচেয়ে বড় সম্মান হলো সত্যকে সামনে আনা এবং অন্যদের নিরাপদ রাখার চেষ্টা করা।
সেদিন রাতে সে আবার মায়ের ডায়েরির শেষ পাতাটি খুলল।
সেখানে ছোট্ট একটি বাক্য লেখা—
"যদি কোনোদিন আমি না থাকি, তবুও আমার সন্তানরা যেন সৎ মানুষ হয়ে বাঁচে।"
রিফাত অনেকক্ষণ সেই লেখার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে ডায়েরিটি বন্ধ করল।
চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়াল।
জানালার বাইরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
তার মনে হলো, অন্ধকার এখনও আছে, কিন্তু দূরে কোথাও ক্ষীণ এক আলোও জ্বলছে।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,
"মা, আমি ভেঙে পড়ব না। তোমার শেখানো পথেই চলব।"
সেই মুহূর্তে রিফাত একটি সিদ্ধান্ত নিল।
সে আর শুধু একজন স্বজনহারা ছেলে হয়ে বাঁচবে না।
সে সত্যের জন্য লড়বে, তার পরিবারের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখবে, আর যতটা পারে অন্যদের সতর্ক করবে।
যত দীর্ঘই হোক পথ, যত কঠিনই হোক সময়—
সে হার মানবে না।
চলবে......