ঢাকা, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬,
সময়: ০২:৪০:২২ PM

স্বার্থের কথা মুখে, সুযোগ পেলেই উপসচিবের দৌড়ে!

ষ্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
29-06-2026 12:23:33 PM
স্বার্থের কথা মুখে, সুযোগ পেলেই উপসচিবের দৌড়ে!

শিক্ষা ক্যাডারের স্বার্থ রক্ষার দাবিতে সোচ্চার, মামলা-মোকদ্দমা থেকে শুরু করে দূরবর্তী কলেজে বদলির প্রতিবাদ—সব ক্ষেত্রেই নিজেদের নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন একশ্রেণির নেতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ ও ঘরোয়া সভার মাধ্যমে তাদের অবদান প্রচারের জন্য রয়েছে সুসংগঠিত কোরাস টিমও। কিন্তু বাস্তবে সুযোগ এলেই তারাই শিক্ষা ক্যাডার ছেড়ে প্রশাসন ক্যাডারের কোটায় উপসচিব পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করছেন। এতে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।

শিক্ষা ক্যাডারে এ ধরনের প্রবণতার পুরোনো একটি আলোচিত উদাহরণ হলেন অলিউল্লাহ মো. আজমতগীর। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষা ক্যাডার সমিতির মহাসচিব থাকাকালেই তিনি উপসচিব পদে আবেদন করে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেন। অনেকেই তখন এই পদক্ষেপকে শিক্ষা ক্যাডার সমিতির আদর্শ ও চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা এবং সমিতির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেছিলেন।

কিন্তু সময়ের ব্যবধানে চিত্র পাল্টে গেছে। যারা একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আজমতগীরের সমালোচনায় সরব ছিলেন, তাদেরই অনেককে এবার গোপনে উপসচিব পদে আবেদন করতে দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি প্রক্রিয়ায় শিক্ষা ক্যাডারের ৩৬১ জন কর্মকর্তা উপসচিব পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, আবেদন প্রক্রিয়ায় এখনো স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। কখনও শেষ মুহূর্তে ওয়েবসাইটে তালিকা প্রকাশ, কখনও মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তার কাছে পেনড্রাইভে এক তালিকা এবং কাগজে আরেক তালিকা জমা দেওয়া, আবার কখনও উচ্চপর্যায়ের তদবিরে কোনো সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার মতো নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), ডিআইএসহ কয়েকটি দপ্তরে দায়িত্ব পালনকারী কিছু কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কেন্দ্রীয় শিক্ষা ক্যাডার সমিতিকে দুর্বল করে ব্যাচভিত্তিক উপ-সমিতি গড়ে তোলেন। বিশেষ করে ১৬, ১৭, ২৪ ও ২৬ ব্যাচের নামে গঠিত এসব ব্যাচভিত্তিক সংগঠনকে অনেকেই মূল সমিতির বিকল্প বা ‘পকেট সমিতি’ হিসেবে আখ্যা দেন। অভিযোগ রয়েছে, এবার উপসচিব হওয়ার দৌড়েও এসব উপ-সমিতির নেতারাই সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। পদোন্নতির জন্য পাঠানো তালিকায় তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি।

বর্তমানে দেশে ২৬টি ক্যাডার সার্ভিস রয়েছে। প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে মোট পদের ৭৫ শতাংশ প্রশাসন ক্যাডার এবং অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ অন্যান্য ক্যাডার থেকে পূরণ করা হয়। এ লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত ৭ এপ্রিলের মধ্যে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের তালিকা পাঠানোর নির্দেশ দেয়। নীতিমালা অনুযায়ী, বিসিএস ৩১ ব্যাচ পর্যন্ত যেসব কর্মকর্তা সিনিয়র স্কেলে অন্তত পাঁচ বছর এবং সংশ্লিষ্ট ক্যাডারে ন্যূনতম ১০ বছর চাকরি সম্পন্ন করেছেন, তারা পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হওয়ার যোগ্য।

এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) বিদায়ী মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) বি. এম. আব্দুল হান্নান জানান, পদোন্নতির জন্য যোগ্য ৩৬১ জন কর্মকর্তার তালিকা গত রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তালিকায় ২৪ ব্যাচসহ কয়েকটি ব্যাচভিত্তিক সংগঠনের নেতাদের নামই তুলনামূলকভাবে বেশি রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষা ক্যাডারের স্বার্থ রক্ষার কথা বললেও বাস্তবে ব্যক্তিগত পদোন্নতি ও প্রশাসনিক পদ লাভের আকাঙ্ক্ষাই অনেক নেতার মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। ফলে ক্যাডারের আদর্শ, ঐক্য ও পেশাগত স্বার্থ প্রশ্নের মুখে পড়ছে। শিক্ষা ক্যাডারের সাধারণ সদস্যরা মনে করছেন, যারা প্রকাশ্যে ক্যাডারের স্বার্থ রক্ষার কথা বলেন অথচ গোপনে অন্য ক্যাডারের কোটায় পদোন্নতির চেষ্টা করেন, তাদের অবস্থান ও ভূমিকা নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন প্রয়োজন।