২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দমনে মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত বহু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এখনো সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। বরং তাদের একটি বড় অংশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের মতো নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন। এ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী, আহত ব্যক্তি এবং নিহতদের স্বজনদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। তারা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত ৯৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের তালিকা ও তাদের বর্তমান পদায়নের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গণঅভ্যুত্থানের সময় দায়িত্ব পালনকারী এসব কর্মকর্তার উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত। অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলন চলাকালে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মাঠপর্যায়ে থেকে কঠোর অভিযান পরিচালনা করেন এবং অনেক ক্ষেত্রে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তৎকালীন সরকার আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্ট বা রাজনৈতিকভাবে অনুগত হিসেবে বিবেচিত কিছু কর্মকর্তাকে বিশেষভাবে দায়িত্বে নিয়োজিত করেছিল। গোয়েন্দা সংস্থার ইতিবাচক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় মোতায়েন করা হয়। সরকার পরিবর্তনের পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে অনেকে নতুন প্রশাসনিক কাঠামোতেও প্রভাবশালী পদে বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগেও এ তালিকার একাধিক কর্মকর্তা বর্তমানে কর্মরত। এর মধ্যে মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন সারোয়ার, যিনি জুলাইয়ের ১, ৪ ও ৫ আগস্ট ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-৯ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে তিনি রাষ্ট্রপতির প্রটোকল অফিসার এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, পোস্টিং অ্যান্ড ডেপুটেশন (এপিডি) অনুবিভাগেও কর্মরত ছিলেন।
একইভাবে নিকারুজ্জামান বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ২০, ২১, ২৩, ২৬, ২৭ ও ৩০ জুলাই রাজধানীর রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া এস এম মুনিম লিংকন এবং মো. আক্তারুজ্জামান, যারা জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন, তারাও বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েও তালিকাভুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। মোছা. আকলিমা বেগম আন্দোলনের সময় ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ছিলেন। ৫ আগস্টের পর তাকে টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলায় ইউএনও হিসেবে বদলি করা হলেও সম্প্রতি তাকে সচিবালয়ে পদায়ন করা হয়েছে। এছাড়া মইন উদ্দিন ইকবাল এবং আলমগীর কবীর বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আন্দোলনের সময় তারা রাজধানীর বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি রয়েছে সহকারী কমিশনার সায়েম ইমরানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর রামপুরা টিভি ভবন এলাকায় ২৭৯ রাউন্ড গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার ঘটনায় তিনি দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে তিনি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে কর্মরত। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সরকার পরিবর্তনের পর তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করে নতুন প্রশাসনিক বলয়ে প্রভাব বিস্তারের উদ্যোগ নেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েও তালিকাভুক্ত তিন কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। তাদের মধ্যে উপসচিব স্নেহাশীষ দাশ ১ থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। উপসচিব সুজিৎ দেবনাথ ২০ থেকে ৩১ জুলাই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন। খন্দকার রবিউল ইসলামও ২০ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত শেখ শামসুল আরেফিন বর্তমানে বাণিজ্য সচিবের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ৪ ও ৫ আগস্ট ইসিবি চত্বর এবং রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন। একই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মেহেদী হাসানও ২০ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন।
অর্থ বিভাগেও তিনজন কর্মকর্তা বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। সৈয়দ আশরাফুজ্জামান, দেবাংশু কুমার সিংহ এবং উপসচিব মাসুদ রানা আন্দোলনের সময় রাজধানীর বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তারা অর্থ বিভাগের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী দায়িত্বে রয়েছেন।
মাঠ প্রশাসনেও এ তালিকার বহু কর্মকর্তা বহাল রয়েছেন। তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অন্তত ৫১ জন কর্মকর্তা আন্দোলন দমনে সরাসরি মাঠে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে অনেককে বিভিন্ন জেলায় বদলি করা হলেও তারা এখনো ইউএনও এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে আশুগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ সদর, শিবালয়, নারায়ণগঞ্জ সদর, নবাবগঞ্জ এবং শিবচরসহ বিভিন্ন উপজেলায় তাদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যাচ্ছে। এছাড়া পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়েও তালিকাভুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা এখনো কর্মরত রয়েছেন।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারির আন্দোলনকারীরা। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদীন শিশির বলেন, আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে যাদের বিচারের মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল, তারা এখন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের জন্য বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। তার মতে, একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে প্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের যেসব কর্মকর্তা গণঅভ্যুত্থানের সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষ প্রমাণিত হলে আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
সামগ্রিকভাবে ঘটনাটি প্রশাসনের জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই এবং প্রমাণিত ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি এখন আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি সচেতন নাগরিক সমাজেরও অন্যতম প্রধান প্রত্যাশায় পরিণত হয়েছে।