মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলতি বছরের মধ্যেই দেশে ফেরার ঘোষণাকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। তার এই বক্তব্যের পর দেশ-বিদেশে পক্ষে-বিপক্ষে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশে ফিরলে তাকে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে এবং রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
বাংলাদেশে সাবেক মার্কিন ডেপুটি চিফ অব মিশন হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন কূটনীতিক জন এফ. ড্যানিলোভিচ এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) মন্তব্য করেছেন। তিনি লিখেছেন, "শেখ হাসিনা কারাগারে অথবা নির্বাসনেই মৃত্যুবরণ করবেন এবং নতুন বাংলাদেশে তার ও তার পরিবারের কোনো স্থান হবে না।"
তিনি আরও বলেন, "আওয়ামী লীগ যত দ্রুত পরিস্থিতি উপলব্ধি করে প্রয়োজনীয় সংস্কার গ্রহণ করবে, ততই দেশের মানুষের জন্য মঙ্গলজনক হবে।"
জন এফ. ড্যানিলোভিচ কে?
জন এফ. ড্যানিলোভিচ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক। তিনি ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে ডেপুটি চিফ অব মিশন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ. মোজেনার অধীনে কর্মরত ছিলেন।
দায়িত্ব পালনকালে তিনি বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম (টিকফা) চুক্তির প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি পরিচিত ও আলোচিত কূটনীতিক ছিলেন। এছাড়া তিনি সাবলীলভাবে বাংলা বলতে পারেন।
দেশে ফেরার ঘোষণা
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক ই-মেইল সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পরিকল্পনা, আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা, নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। গত রোববার সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফেরা তার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়; বরং বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিচারিক প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, "সব বাধা ও ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে আমি এ বছরই দেশে ফিরব।"
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে তিনি দিল্লিতে অবস্থান করছেন।
আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
তার দেশে ফেরার ঘোষণার পর বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত। তাদের মতে, দেশে ফিরলে তাকে প্রথমেই বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে অতীত শাসনামল নিয়ে দলটিকে জনগণের কাছে জবাবদিহিও করতে হবে। ফলে তার প্রত্যাবর্তন নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ বলেই বেশি প্রতীয়মান হচ্ছে।
চিফ প্রসিকিউটরের মন্তব্য
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা "রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি" ছাড়া আর কিছু নয়।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার যদি সত্যিই সাহস থাকে, তবে দেশে এসে জুলাই হত্যাযজ্ঞের বিচার মোকাবিলা করা উচিত।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ২৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে জুলাই হত্যাযজ্ঞ-সংক্রান্ত ১০টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের হাতে এসেছে। এসব প্রতিবেদনে সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান খান, আমির হোসেন আমু এবং সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকসহ বিভিন্ন অভিযুক্তের নাম রয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে দ্রুত আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে বলেও তিনি জানান।
মামলার রায়
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত বছরের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তার বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে মৃত্যুদণ্ড এবং দুটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।